“আমাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে”

নারী কর্তৃক দায়ের করা যেসব অভিযোগ নারীর নিজের জন্যেই সবচেয়ে অবমাননাকর এবং নির্যাতিত অন্য সব নারীদের অধিকারপ্রাপ্তির পথকে বাধাগ্রস্ত করে তার মধ্যে অন্যতম অভিযোগ হচ্ছে- “আমাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে”। এটা একদিকে যেমন মানুষের কাছে ‘ধর্ষণ’কে হাস্যকর করে তোলে আরেকদিকে সত্যিকারের নিপীড়িত নারীদের প্রতি হওয়া নিপীড়নকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা এক নিত্য সত্য। সভ্যতার অগ্রগতিতে নারী নির্যাতন কমে আসবার কথা থাকলেও এই বদ্বীপে উল্টো বেড়েছে যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, অপহরণের ঘটনা। এসব ঘটনায় নির্যাতিতদের আইনি সুবিধার্থে ২০০০ সালে সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন তৈরি করে। সে আইনকে ২০১৩ সালে সংশোধন করে আরো কঠোর করা হয়। এই আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং নিপীড়িতের ন্যায় বিচার প্রাপ্তি ও অপরাধীর সাজার ব্যাপারে আমরা আশান্বিত হই। কিন্তু এরই মাঝে নারী অধিকারের পক্ষে কাজ করা আমাদেরকে উল্টো চিত্রও দেখতে হয়। যা আমাদের বিব্রত করে। বাংলাদেশে আইন ও নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থার মতামতকেও যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তবে দেখতে পাই যে নারী নির্যাতন দমন আইনের কিছু অপব্যবহারও হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অপব্যবহার মানে এই আইনে কাউকে মিথ্যে অভিযুক্ত করা। প্রেম করেছেন, শারীরিক সম্পর্ক করেছেন, সম্পর্ক কোন কারণে ভেঙে গেছে এই পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটিই ভীষণ স্বাভাবিক। বিচ্ছেদ স্বাভাবিক, এই স্বাভাবিক বিষয়টিকে যদি স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার যোগ্যতা না থাকে তাহলে দয়া করে প্রেমে জড়ানো থেকে বিরত থাকুন। অজস্র স্বপ্ন বুনে চলা একটা প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়াটা বেদনার। সম্পর্কের উপর কোন পক্ষের আগ্রহ হারিয়ে ফেলার কারণে বিচ্ছেদ হতেই পারে। অথবা হতে পারে পরিকল্পিতভাবেই কেউ আপনার সাথে শারীরিক সম্পর্ক করার জন্য প্রেম করলো। কিন্তু যখনই আপনি তার সাথে সম্পর্কে যাচ্ছেন এবং দুজন সানন্দ্যে শারীরিক সম্পর্ক উপভোগ করছেন, তখন সেই সানন্দ্য সম্পর্ককেই পরবর্তীতে ধর্ষণ বলে প্রচার করা অযৌক্তিক। এটা আমার বিবেচনাবোধ বলে। আপনি একটা সম্পর্কে জড়ানোর পর সেখানে বিশ্বাস ভাঙার ঘটনা ঘটতে পারে, সেখানে প্রতারণার ঘটনা ঘটতে পারে এবং এই ধরনের ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা নেবার সুযোগ আপনার রয়েছে। কিন্তু কোনভাবেই আপনি আপনার দুজনার সম্মতিতে দুজনার আনন্দের সময়কে আরেকজনের উপর ক্রাইম বলে চালাতে পারেন না। অন্তত ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অভিযোগ তো অবশ্যই না। আপনি জানেন যে ধর্ষণের মামলা জামিন অযোগ্য। এই প্রক্রিয়ায় প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করা যায় ভালো। আইনের এই অপব্যবহারের ভাবনাটাই একটা ফৌজদারি অপরাধ। অভিযোগ করতে হলে আপনি সুনির্দিষ্ট প্রতারণার অংশটুকু নিয়ে করুন। মামলাকে মজবুত করতে গিয়ে বা প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠা আপনার সাবেক প্রেমিককে হেনস্তা করার জন্য তার উপর মিথ্যে ধর্ষণের অভিযোগ চাপিয়ে দেবেন না। আপনার এই একটা মিথ্যে অভিযোগের কারণে মানুষের কাছে ধর্ষণের মতো একটা সিরিয়াস বিষয়ও সাধারণ ঘটনা বা “ধুর মাইয়ারা তো সামান্য মনোমালিন্য হইলেও ধর্ষণের মামলা দেয়। আসলে কি ধর্ষণ হইছে নাকি”- এইরকম একটা ভাবনার বিস্তার ঘটায়। এবং ধর্ষকামী পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার পুরুষরা তাদের অপরাধকে মিথ্যে প্রমাণ করতে আপনাদের মিথ্যাচারগুলোকে উদাহরণ হিসেবে সামনে তুলে আনে। একটা মিথ্যে আরেকটা মিথ্যের সহায়ক হয়ে দাঁড়ায়। অতএব আপনি যখনি অন্য কোন অপরাধ বা দ্বন্দ্বের কারণে ধর্ষণের অভিযোগ তুলছেন তখন মূলত আপনিই আরেকজন নারীকে তার প্রতি হওয়া অন্যায়ের জন্য ন্যায় বিচার পাবার পথে বাধা তৈরি করছেন। আমাদের বিচার প্রক্রিয়ায় যুক্ত যারা রয়েছেন তারাও শুরু থেকেই একজন সত্যিকারের ভিক্টিমকে ‘মিথ্যে মামলা করলো কিনা’ টাইপ সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। আর সোস্যাল মিডিয়া ট্রায়ালের কথা তো জানাই আছে। আপনি অনলাইন নিউজ পোর্টালের ধর্ষণের সংবাদের কমেন্ট সেকশন চেক করলেই দেখতে পাবেন সেখানে কেউ না কেউ এসে অন্য কোন মিথ্যে ধর্ষণ মামলার উদাহরণ টেনে এই সংবাদকে প্রত্যাখ্যান করার চেষ্টা করছে। ক’দিন আগে আমার সাথে ঘটা একটা ঘটনা শেয়ার করি। আমার একজন ফেসবুক নারী বন্ধু যিনি দেশের বাইরে থাকেন এবং একসময় #মিটু মুভমেন্টের কারণে আলোচিত ছিলেন। তিনি আমার কাছে একটা ধর্ষণের অভিযোগ জানালেন। আমি তার কথায় বিশ্বাস করে আমার আরেক সাংবাদিক বন্ধুকে ঘটনাটা তদন্ত করতে যুক্ত করলাম। তারপর সবকিছুর হিসেব মিলিয়ে দেখতে গিয়ে আমিই হতভম্ব। যার নামে ধর্ষণের অভিযোগ তুলেছেন তিনি একজন আইনজীবী ও লেখক। সেই নারী বন্ধুটির অভিযোগের বাস্তবতা ঘাটতে গিয়ে দেখলাম পরতে পরতে সেই নারীর মিথ্যাচার। তিনি আমাকে প্রথমে বলেছেন ঘটনাটা অন্য একজন নারীর সাথে ঘটেছে। আমি প্রমাণ করে দিলাম যে সেটা তার নিজের ঘটনা। তিনি জানালেন যে অভিযুক্ত ব্যক্তি তাকে ধর্ষণ করেছে তাদের দুজনার সম্পর্ক ছিল কেবল বন্ধুত্ব পর্যন্ত। এবং নারীটি অভিযুক্তকে ‘বাবা’ বলে ডাকতেন। এরপর আমি প্রমাণ করে দিলাম যে তাদের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তারপর নারীটি আমাকে জানালো, প্রেম থাকলেও তাদের পূর্বে শারীরিক সম্পর্ক ছিল না। সেদিন নারীটিকে ধর্ষণ করার জন্যেই মিথ্যে বেড়ানোর কথা বলে তার প্রেমিক নিয়ে গিয়েছিল। আমি প্রমাণ করে দিলাম যে তারা সেদিন বেড়াতে যাবার আগেও দেশের বাইরে একসাথে ছিল। এবং দেশে এসে সেদিন বেড়াতে যাবার আগেও দুজনে নারীটির বোনের বাসায় একাধিক দিন একসাথে ছিল। তাদের একসাথে থাকায় তার বোনেরও সম্মতি ছিলো। তারপর অভিযোগকারী নারীটি আমাকে ও আমার বন্ধুকে জানালো যে সেদিন ধর্ষণের ঘটনা ঘটার পরে আর তার সাথে সেই পুরুষটির দেখা হয়নি। আমি সেটাও প্রমাণ করে দিলাম যে তার উল্লেখিত দিনের পরেও নারীটি সেই পুরুষের কার্ড থেকে টাকা পে করে দেয়া এয়ার টিকিটে দেশে এসেছেন এবং তারা সাক্ষাৎ করেছেন। এবং আসার সময় নারীটি অভিযুক্তের জন্যে উপহার হিসেবে শার্টও কিনেছেন। যখন একে একে এভাবে তাকে তার মিথ্যেগুলো ধরিয়ে দেয়া হলো তারপরই তিনি দাবি করলেন তাকে ধর্ষণ করা হয়নি, যৌন হয়রানি করা হয়েছে। অথচ শুরু থেকেই তিনি আমাকে ও আমার সাংবাদিক বন্ধুকে বলেছিলেন যে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। একপর্যায়ে আমার কাছে যেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে অভিযোগকারী নারীটির মূল ক্ষোভ তার প্রাক্তন প্রেমিকের বিরুদ্ধে নয়। তার মূল ক্ষোভ প্রাক্তন প্রেমিকের স্ত্রীর উপর। কেননা তাদের প্রেমের কথা জানার পরে প্রেমিকের স্ত্রী এই ধর্ষণের অভিযোগ আনা নারীকে ‘প্রস্টিটিউট’ বলে গালি দিয়েছিল। এই ক্ষোভ থেকেই মূলত সাবেক প্রেমিক আর তার স্ত্রীর সংসার ভেঙে দেবার অস্ত্র ছিল তার এই ধর্ষণের অভিযোগ। এখানে অবাক করা বিষয় হচ্ছে একজন নারী আরেকজন নারীর প্রতি প্রতিশোধ নিতেও ব্যবহার করতে চেয়েছে ‘ধর্ষণ’ এর মতো একটি সেনসেটিভ ইস্যুকে। এই যদি হয় ধর্ষণের অভিযোগের নমুনা তবে সত্যিই নারী নির্যাতন মামলার প্রতি হতাশ হয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আমাদের অন্য কোন পথ থাকে না। এমনিতেই বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত হওয়া নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে মামলা বা অভিযোগ দায়ের হয় খুবই কম। কেননা আমাদের বিচার প্রক্রিয়ার উপর আস্থাহীনতা এবং সামাজিক মর্যাদাহানী ও হেনস্থার কথা ভেবে বেশিরভাগ নারীই নির্যাতিত হবার পরেও সেই নির্যাতনের প্রতিবাদ করতে সাহস পায়না। সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নারীর অন্তর্গত এই ভয়, লজ্জা ও দ্বিধা দূর করা জরুরি। তার ভেতর আস্থা জাগানো জরুরি যে তোমার উপর হওয়া অন্যায়ের বিচার পাওয়াটা তোমার অধিকার এবং সমাজ তোমাকে সেই অধিকার পেতে সাহায্য করবে। যেখানে নারী অধিকারের পক্ষে কিছু মানুষ ও সংগঠন লাগাতার কাজ করে যাচ্ছে নারীর ভেতর এই আস্থা ও সাহস যোগান দিতে, সেখানে আপনার করা একটি মিথ্যে অভিযোগ সেইসব নারী অধিকারের পক্ষে লড়াই করা নারীদের আন্দোলনকে পিছিয়ে দিচ্ছে অনেকটাই। এমনিতেই এই পুরুষতান্ত্রিক নোংরা সমাজে নারীর অপরাধ পদে পদে। নারীকে হেনস্তা করার জন্য মুখিয়ে আছে পুরো সিস্টেমটাই। এখানে নারীকে ভার্চুয়ালি বা বাস্তবে কখনো না কখনো অন্যায়ভাবে হেনস্তা করছে এমন কিছু পুরুষকে যদি জেলখানায় বন্দি করা শুরু হয় তবে এই দেশে আর মুক্ত পুরুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না।যখন চারদিকে এই পরিস্থিতি তখন শুভবুদ্ধির সবারই লড়াই করা উচিত নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে। এবং পুরো বিষয়টি নিয়ে সচেতন থাকলে আপনি আপনার সাংবিধানিক অধিকার বলেই তা করতে পারেন। এখানে কোন মিথ্যের দরকার নেই। তাই মিথ্যে অভিযোগ তুলে প্লিজ নারীর অধিকারের সংগ্রামকে প্রশ্নবিদ্ধ করবেন না। আমরা কোনভাবেই আশা করিনা যে একজন নারী তার উপর হওয়া নিপীড়ন ও নির্যাতনের বিচার থেকে বঞ্চিত হোক। কোনভাবেই নারী নির্যাতনকারী ও ধর্ষণকারীর মতো ঘৃন্য অপরাধী যাতে আইনের ফাঁক গলে বেড়িয়ে না যায়। তাকে সামাজিক, পারিবারিক ও আইনগতভাবেই বাধ্য করা হোক তার সাজা বুঝে নিতে। পাশাপাশি একজন নিরপরাধ পুরুষও যাতে নারী নির্যাতনের মতো একটা অভিযোগে অভিযুক্ত না হয়। কেননা এই একটা মিথ্যে অভিযোগ একজন ব্যক্তি ও তার পরিবারকে কোন্ পরিস্থিতির মধ্যে নিয়ে ফেলতে পারে সেটার ধারণাও হয়তো আমাদের নেই। আমরা নির্যাতনের বিলুপ্তি চাই। আমরা সমতা চাই। আমরা ন্যায়ভিত্তিক একটা সামাজিক কাঠামো চাই। অপরাধীকে তার জেন্ডার নয়, তার অপরাধ দিয়েই বিচার করতে চাই। সর্বশেষ কথা- প্রেম সুন্দর। প্রেমিক প্রেমিকার কাটানো একান্ত মুহূর্তগুলো সুন্দর। আবার আপনি চাইলে আপনাদের বিচ্ছেদটাও হতে পারে সম্মানজনক সুন্দর। আর যদি প্রেমের বিচ্ছেদকে মেনে নিয়ে মাথা উঁচু করে চলার শিক্ষাটা আপনি অর্জন করতে না পেরে থাকেন, যদি মনে করেন যে প্রেম করে শারীরিক সম্পর্ক করেছেন এখন সে আপনাকে বিয়ে না করলে আপনার ইজ্জত সম্ভ্রম সব চলে যাবে, আপনার যোনীতেই ছিলো আপনার পুরোটা সম্মান, তাহলে প্লিজ প্রেমের পথে পা বাড়াবেন না। আমাদের এই পুরুষতান্ত্রিক ও মৌলবাদী সমাজ ব্যবস্থায় একজন নারীর প্রেম করতে যেমন সাহস লাগে তেমনই প্রেম ভেঙে গেলে ‘গো টু হেল’ বলে সামনে এগিয়ে যেতেও সাহস লাগে। সাহস অর্জন করুন। কেননা একজন নারী হিসেবে এই সমাজে আপনার পথটা মসৃণ নয়। লড়াই করেই এগুতে হবে। আর লড়াইটা হবে সত্যের, লড়াইটা হবে অধিকারের। মিথ্যে দিয়ে লড়াই হয়না। তাতে লড়াই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিঃদ্রঃ কারো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কারণে আপনি প্রতারিত হলে অবশ্যই আপনাকে বলবো ‘প্রতারণা মামলা’ করুন, আমাদের সমর্থন থাকবে। কিন্তু পাঁচ বছর প্রেম করার পরে এসে প্লিজ দাবি করবেন না যে আপনাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে। এখানে ধর্ষণ শব্দটাই বেমানান। ধর্ষণ সেটা যে কেউই করতে পারে। স্বামীও স্ত্রীকে করতে পারে। সেই ক্ষেত্রে স্বামীর বিরুদ্ধেও মামলা করতে পারেন স্ত্রী। চাইতে পারেন তার উপর হওয়া নিপীড়নের বিচার। কিন্তু ‘বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ’ এই টার্মটা আলাদা। আমাদের নারীদের কাছে এই সময়ে এসেও বিয়েটা কতোটা লোভনীয় একটা বিষয় এই ভাবনাটাকেও কিন্তু খুঁচিয়ে দেয় এই অভিযোগ। Published: https://feministfactor.com/4571/

Leave a Reply

Your email address will not be published.