কাটা লাশের শরীর

আলেয়া খালার সাথে আমার পরিচয়টা খুব অদ্ভুত ভাবে। সেবার আমি বেড়াতে গিয়েছিলাম বান্দরবনে। মূলত শহুরে হাওয়ায় দম বন্ধ হয়ে এলে ধনীরা যেমন হাওয়া বদলের জন্য ঘুরতে বের হয় অনেকটা তেমন। যদিও আমি দারিদ্রতার মাইলফলকের সর্বশেষ পিলারের সাথে হেলান দিয়ে তখন বিশ্বের সফল ব্যাক্তিদের জীবনী পাঠ করছিলাম। এক বন্ধুর অনুগ্রহে কিছু টাকা হাতে এসে গেলো বলেই সেবার শহর ছেড়ে পালালাম। পাহাড়ের উপরে একটা সস্তা দরের হোটেলে উঠলাম। হোটেলটা অতোটা পরিপাটী না হলেও এই হোটেল থেকে বাহিরের যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সেটা প্রকৃতি পরিপাটী করে সাজিয়ে দিয়েছে। হোটেলে তিনদিন কেটে যাবার পর চারনাম্বার দিনের সন্ধ্যাবেলায় টের পেলাম যে ঘরে রাখা কেরু’র বোতল খালি। আমি রাতের পাহাড়ি রাস্তায় চলাফেরায় খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্য না হলেও মদের খোঁজে বের হলাম। পাহাড়ি রাস্তা ধরে প্রায় চার কিলোমিটার পায়ে হেঁটে নিচে নামার পরে একটা বাজারের মতো জায়গা সেখানে একটা দেশী মদের দোকান আছে। এখানে দামী মদ বলতে কেরুটাই পাওয়া যায়। আর বাকি বাংলা আর পাহাড়ি দো চোয়ানি। মদের দোকানটা তখন বন্ধ করার উদ্যোগ নিচ্ছিলো দোকানী। দোকানটা চালায় বাঙালী এক দম্পতী। এর আগে দুইবার দোকানে এলেও কখনো তেমন কথা হয়নি। পুরুষটি সম্ভবত শারীরিকভাবে অসুস্থ। অসুস্থতায় শরীর ভেঙ্গে পড়ায় বয়স ঠিকঠাক ধারণা করতে কষ্ট হয়। তবে সম্ভবত পঁয়ষট্টির এর কাছাকাছি। দুইবারই তাকে দেখেছি দোকানের টুলে বসে বাসের খুঁটিতে হেলান দিয়ে কাশছে। আর চোখ পিটপিট করে ঝিমুচ্ছে। নারীটিই মূলত বেচা বিক্রির কাজগুলো করছে। নারীটির বয়স সহজেই অনুমান করা যায়। পঞ্চাশের আশেপাশে হবে। দুই বোতল কেরু হাতে নিয়ে আমি যখন অন্ধকারে ফিরে যাবার পথ নিয়ে কিছুটা সন্দিহান তখনই দোকানী নারীটি জানতে চাইলো

কই যাইবেন ? শহর থিকা আইছেন ?

আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে নারীটির দিকে তাকিয়ে বললাম

ঢাকা থেকে এসেছি। বেড়াতে। মেঘকন্যা হোটেলে যাবো

একলাই যাইবেন ? লগে টর্চ লাইট আছে ?

না তা তো নেই। আসার সময় এতোটা অন্ধকার ছিলোনা…

পথে সাপকোপ পড়ে। খারান দোকান বন্ধ কইরা আমরাও হেদিকেই যামু। আমাগো লগেই যাইয়েন

নারীটির কথায় কিছুটা স্বস্তি পেলাম। দোকানে এই মুহুর্তে দোকানী নারী পুরুষ দুজন আর আমি ছাড়া কেউ নেই। নারীটি আস্তে আস্তে দোকান গোছাতে লাগলো। পুরুষটি বরাবরের মতোই টুলে বসে ঝিমাচ্ছে।

সবকিছু গোছগাছ করে দোকান বন্ধ করে পথে নামতে আমাদের আরো আধঘণ্টা সময় লাগে। কিছুটা পথ পার হয়ে আসার পর নারীটি কথা বলতে শুরু করে

আপনের নাম কি ?

সাঈদ আহমেদ

এহানে কি ঘুরতে আইছেন ?

না লিখতে এসেছি। প্রকৃতির নির্জনতায় বসে কদিন লিখতে চাই

আপনে কি লেখক

হ্যা গল্প টল্প লিখি আর কি

ভালা করছেন। পাহার গল্পের জন্যি ভালা জায়গা। এহানে অনেক গল্প আছে

তাই নাকি ? কই আমি তো গল্প পাইনা

গল্প কি আর আর পাহারে পাহারে ঝুইলা থাহে। গল্প থাহে মাইনশের মুনে

নারীটির কথা শুনে আমার মনের মধ্যে একটা আশার স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠলো। কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলাম। অসুস্থ পুরুষটি কিছুটা হেঁটে হাপিয়ে গিয়েছে। বসে পড়েছে পথের পাশে। আমরাও দাঁড়িয়ে পড়লাম। কিছুটা বিশ্রাম নেয়া যাক।

আপনার কথা শুনে মনে হয়না যে আপনি এখানকার স্থানীয়। মানে আপনার ভাষা

না আমি এহানকান না। এহানে তো আইলাম নয় বচ্ছর হইবো

তার আগে কোথায় ছিলেন ?

ঢাকায় ছিলাম। আমগো গ্রামের বাড়ি আছিলো নওগাঁয়। হেইসব কতো কাহিনি

ঢাকা থেকে চলে এলেন কেনো ?

আমি ঢোম আছিলাম

মানে মর্গে ?

হ লাশ কাডাকাডির কাম

আমি একটু চমকে উঠলাম। যদিও আমি লাশ মৃত্যু এসব নিয়ে খুব বেশি বিচলিত হইনা। কিন্তু এই নির্জন পাহাড়ি রাস্তাই হয়তো আমাকে কিছুটা বিভ্রান্ত করে দিলো। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে নিলাম। সিগারেট জ্বালাতে জ্বালাতে প্রশ্ন করলাম

আচ্ছা লাশকাটা ঘর নিয়ে তো অনেক ভৌতিক গল্প প্রচলিত আছে। আপনার তো তবে অনেক ভূতের গল্প জানা আছে

হাহাহা…

নারীটি একদমক হেসে নিলো। তার হাসি যেনো থামতেই চায়না। পুরুষটি তার ঘোলাটে চোখ মেলে একবার নারীটির দিকে তাকালো। নারীটির হাসির শব্দ পুরুষের তন্দ্রা ভেঙে দিয়েছে

মাইনশের চেয়ে বড় কোন ভুত পেত্নি নাই। যেহানে মানুশ থাহে হেহানে ভুত আহেনা ডরে

আমি নারীর কথা শুনে তার দিকে তাকালাম। আধো অন্ধকারে টর্চের সামান্য আলোর আভায় বুঝতে পারলাম তার মুখ কিছুটা গম্ভীর হয়ে এলো। আমি প্রশ্ন করলাম

মর্গে আপনার ভয় করতো না ?

হ পথম পথম করতো হেরপর আর লাগতো না। এই আলেয়াই আছিলো মেডিকেলের সবচেয়ে সাহসী ডোম

আপনের নাম তাহলে আলেয়া ?

হ। আলেয়া বিবি

আচ্ছা আমাকে আপনার মর্গে কাজের কিছু অনুভূতি বলবেন মানে যদি কিছু লেখার বিষয় পেয়ে যাই

না তেমন কিছু জানিনা। লন হাঁটি

নারীটি পুরুষটিকে ধরে দাঁর করালে আমরা পুনোরায় হাঁটতে শুরু করলাম। নারীটির কথায় গল্পের আভাষ পেয়ে আমি কিছুটা ভাব জমানোর ইচ্ছে নিয়েই তাকে বললাম

আপনাকে আমি আলেয়া খালা বলে ডাকি ?

সে একবার আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো

ডাকেন…

আচ্ছা খালা আমি বুঝতে পারি আপনার জানা অনেক ঘটনা আছে। যদি বলেন তবে আমার উপকার হয়

সবকিছু বেশি জানলেই সমস্যা বেশি বুজলেন। বেশি জানছি বইলাম আইজ পাহাড়ে

আচ্ছা আপনি বলতে না চাইলে বলার দরকার নেই

গল্প হাত ছাড়া হতে দেখে কিছুটা মন খারাপ লাগলেও হাতের প্যাকেটে থাকা কেরুর বোতল আমার মন খারাপের অনুভূতি কিছুটা কাটিয়ে দিচ্ছিলো। একটা সিগারেট ঠোঁটে নিলাম। রুমে গিয়ে দুই তিন প্যাগ গলায় ডাললেই লেখার মুড এসে যাবে। হঠাৎ মুখ খুললো আলেয়া খালা

কিয়ের গল্প কইমু কন। মাইনশের এতো রুপ দেকছি জীবনে যে ভুত দেহার ইচ্ছাই মইরা গেছে। হের লাইগাই মর্গে আমি কোন ভুত দেহিনাই। খালি মানুশ দেখছি। মাইনশের মইধ্যে ভুত দেখছি।

আলেয়া খালা তার স্বামীর একটা হাত নিজের মুঠোতে ধরে রেখেছে আরেক হাতে টর্চ লাইট

আমি যহন মর্গের কামে যোগ দেই তহনো আমি ওইসব কাম ঠিক ঠাক বুজতাম না। শফুর মায় একদিন অভাবের সংসার দেইখা আমারে কইলো হাসপাতালে কাম করমু কিনা। অভাবের কামড় খাইতে খাইতে তহন চোউক্ষে মুক্ষে আন্ধার দেখতাছি। রাজি হইয়া গেলাম। আমার কামের ব্যবস্থা কইরা দিলো শফুর মায়। কামরাঙ্গির চরের দিকে একটা সরকারী হাসপাতাল। শফুর মায় আছিলো সিনিয়র ডোম। আমি সহকারী। শুরুতে লাশ কাডাকাডির সময় সামনে থাকতে পারতাম না। বমি আইতো। বাইরে খারাইয়া থাকতাম। গোসল দেওনের সময় আর কাফনের কাপর পড়ানির সময় শফুর মায়রে সাহায্য করতাম। শফুর মার লগে আরেকজন ডোম আছিলো আজিতন বিবি। মাইয়া ডোমেরা খালি মাইয়া মাইনশের লাশ গোসল দিতো আর কাফন পড়াইত। বেডা গো লাশের লাইগা বেডা ডোম আছিলো। ছাত্তার, মিজান, বাতেন আর লক্ষ্মণ।

কামে যোগ দেওনের পরেই শফুর মা কইছিলো ‘এহানে যা দেখবি কিছুই বাইরের মাইনশের কাছে কইবি না। এইডা এক অন্য দুনিয়া। এহানে মরা আর জিন্দায় টানাটানি চলে’। আমি শফুর মার কথা তহন বুঝি নাই। পরে বুজছি। যহন বুজছি তখন এই পাহাড়ে আইয়া পলাইতে হইছে।

পাহাড়ে পলানোর সাথে ডোমের কাজের কি সম্পর্ক ?

আপনের মতো আমিও শুরুতে বুজি নাই যে কিয়ের লগে কিয়ের কি সম্পর্ক। হুনেন হুনতে থাহেন তাইলে আমনেও বুজতে পারবেন। হাসপাতালের মর্গটা আছিলো একটু সাইডে। মানি হাসপাতাল থিকা একটু দূরে একটু গাছ গাছিলি দিয়া ঘেরা জায়গা। মাইনশে মর্গের কথা হুনলে ডরায় এজন্যিই মর্গটা দূরে রাখছে। ওদিকে তেমন বেশি মানুশজনও যাইতো না। রাইত বিরাইতে এক্সিডেনের লাশ আইতো, আত্মহত্যা করইন্না লাশ আইতো। হের লাইগা রাইতে দুইজন বেডা ডোম আর দুইজন মহিলা ডোম ডিউটিতে থাকতে হইতো। পাল্ডাইয়া পাল্ডাইয়া ডিউটি পরতো। বেডা ডোমেগো মইদ্যে বাতেন আছিলো সিনিয়র। প্রায় ত্রিশ বছর ধইরা ডোমের কাম করতো। আস্তে আস্তে লাশ কাডাকাডি সবই অভ্যাস হইয়া গেলো। ডাক্তারগো সামনে কাডাকাডি করতে হইতো। হেরপর লাশগুলা নেওনের লাইগা লাশের আত্মীয়জন কেউ না আহা পইযযন্ত মর্গের ফ্রিজে রাখতে হইতো। বেশিদিন দেরি হইলে আজনুমানে খবর দিতে হইতো। সব লাশের নাম্বার লাগাইতে হইত। সব শিক্কা লাইলাম। মর্গের পাশের আছিলো আমাগো নাইট ডিউটির সময় বিস্রাম নেওয়ার রুম।

একদিন হইছে কি আজিতন বিবির হেদিন ডিউটি নাই। আমি আর শফুর মা ডিউটিতে। লগে বাতেন আর লক্ষন। রাইত নয়টার দিকে। এক মাইয়ার লাশ আহে মর্গে। আত্মহত্যার লাশ। বয়স বড়জোর পনারো হইবো। কেউ একজন হাসপাতালে নিয়া আইছিলো হের পর যহন হুনছে মইরা গেছে তহন লাশ থুইয়া ভাগছে। বিষ খাইয়া মরছে। লাশের শইলের একেকখানে রক্ত জমা। মাইরের দাগ। লাশটা ফ্রিজে রাইখা রুমে আইছি বিশ্রাম নিতে। শফুর মাইয়ই কইছে ‘যা তুই গিয়া একটু ঘুমা। লাশ আইলে ডাকমু নে। আমি এহানে থাহি।‘ আমিও আইয়া ঘুমাইলাম। রাইত দুইটার দিকে ঘুম ভাঙলো। ভাবলাম আমি গিয়া ডিউটি দেই শফুর মায়রে বিশ্রাম নিতে পাডাই। বিস্রাম রুম থিকা বাইয়াইয়া লাশ রাহইন্না ফ্রিজ ঘরের পিছন দিয়া ডোম ঘরের দিকে যাইতাছি। তহন আচুক্কা কানে আইলো ফ্রিজ ঘরে কিসের জানি শব্দ হইতাছে। পত্থম পত্থম একটু ভয় পাইয়া গেলাম। আবার মনে হইলো মনে হয় নতুন লাশ আইছে। কেউ লাশ রাখতাছে। একটু ঘুইরা গিয়া জানালার মতো একটা জায়গাইয় গেলাম, এহানে আগে জানালা ছিলো পরে জানালাডা বন্দ কইরা দিছে তয় একটা ফাকা আছিলো। আমরা মাজে মইধে কাউরে খুজতে আইলে এই ফাকা দিইয়া দেকতাম। হের লাইগা ওইডা আমি চিনতাম। সেই ফাকা দিয়া উকি দিলাম

হেরপর আমি যা দেখলাম হেইডার চেয়ে বড় ভুত দেহা হয়না বুঝলেন

এই পর্যন্ত বলে আলেয়া খালা আমার দিকে তাকালো। আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে তারদিকে তাকিয়ে আছি

কি দেখলেন ?

দেখলাম লাশ রাখার টেবিলের উপরে মাইয়াডার লাশ রাখা। রাইতে যারে ফ্রিজে রাইখা আইছিলাম। লাশটার গায়ে কোন কাপর নাই। বাতেন লাশের দুইডা পাও দুই হাত দিয়া ফাক কইরা ধইরা রইছে। বাতেনের গায়েও কোন কাপর নাই। পাশে লুঙ্গী খুইলা রাহা। আমার মনে হইতাছিলো আমিও মনে হয় একটা লাশ। নড়তেচড়তে পারতাছিনা। হাত পাও শক্ত হইয়া গেছে। দেহি বাতেন মাইয়াডার লাশের লগে আকাম করতে শুরু করলো। ও যহন ওর অইডা মাইয়াডার ভিত্রে ডুকাইয়া ধাক্কা দিতেছিলো ধাক্কার লগে মাইয়াডার মুখ দিয়া কালা কালা রক্ত বাইর হইয়া আইতাছে আর বাতেন করতেই আছে। পাগলের মত করতেই আছে। এমন সময় পিছন থিকা কেউ আমার মুখ চাইপা ধইরা আমারে টানতে টানতে বিশ্রাম ঘরে লইয়া আহে। শফুর মা। শফুর মা আমারে ঘরে আইনা চকির উপরে বহায়। আমি কানতেছিলাম ভয়ে।

আমি আলেয়া খালার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। চলতে চলতে কখন যে আমি দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম হেইডা আর আমার মনে নাই। আলেয়া খালাও দাঁড়িয়ে আছে। তার স্বামীটি একটা গাছের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে একটা বিড়ি জ্বালানোর চেষ্টা করছে। পারছেনা। আলেয়া খালা এগিয়ে গিয়ে স্বামীকে বিড়িটা জ্বালিয়ে দেয়। জ্বালিয়ে দিয়ে আমার দিকে ঘুরে তাকায়

হাডেন প্রায় আইয়া পড়ছি

আমি আবার হাঁটতে শুরু করি। এক ঘোর লাগা হাঁটা। আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করতে হয়না আলেয়া খালা নিজে থেকেই মুখ খোলে

সেদিন শফুর মা কতো কথা যে বুঝাইলো আমারে। বুঝলাম যে ওয়িহানে চাকরি করতে গেলে চোখ মুখ বুইজা চাকরি করতে হইবো। আর এসব বাইরে কইলে আমার নিজের জীবন লইয়াই টানাটানি শুরু হইবো। মাইনশের শইল কাইটা টুকরা টুকরা করাডা বাতেন লক্ষ্মণ মিজান ছত্তার অগো কাছে ডাইলভাত। পরে জানছি মাঝে মইধ্যে বাইরে থিকাও বেডারা এইতো মাঝ রাইতে। অল্প বয়সী মাইয়াগো লাশ আইলে বাতেন লক্ষ্মন ওরাই হায়ার কইরা লইয়া আইতো। তয় রোদ এক্সিডেন্টের লাশের লগে ওরা কিছু করতো না। ওগো কতা মাইনা চললে নানা রকম সুবিধা পাও্যা যাইতো। আমিও আস্তে আস্তে মাইনা নিলাম। অনেক সুময় আমি মর্গের সামনে থাকতাম, ফ্রিজ ঘরে এক এক কইরা ডুইকা যাইতো বাতেন লক্ষ্মণরা। একজন বাইরায়, একজন ঢোকে। নিজেরে মানাইয়া নেয়ার লাইগা মনের কইতাম ‘যারে করতাছে হেয় যহন পতিবাদ করেনা তাইলে আমার পতিবাদ করার কি ঠেহা’।

আপনি সব মেনে নিলেন ? মানে কোন মানুষের পক্ষে এমন ঘটনায় মুখ বন্ধ রেখে মেনে নেয়া সম্ভব ?

হ মাইনা নিছিলাম তয় শেষ পইর্যন্ত আর পারি নাই। না পাইরাই ঝামেলা হইলো। দুইন্নাইতে মাইনা নিতে পারলি আর কুনু ঝামেলা নাই।

কি প্রতিবাদ করলেন শেষ পর্যন্ত ?

বাতেন ডোমের বাড়ি আছিলো কাছেই। বৌ আর মাইয়া নিয়া থাকতো। বাতেন মিয়ারে খুজতে দুই একদিন ওর বৌ মাইয়া মর্গের দিকেও আইতো। আমি ওর মাইয়ারে দেকছি। ফুটফুইটা একটা মাইয়া। বয়স সতেরোর মতো হইবো। বাতেন মিয়ার দুনিয়ায় দুইডা জিনিশের পতি মোহাব্বত আছিলো। এক হইলো গিয়া বাংলা মদ আর দুই তার মাইয়া

একদিন বাতেন মিয়া ডিউটিতে আইছে। বাংলা মদ খাইয়া ঝিমাইতাছে। এমুন সময় হের বৌ কানতে কানতে দৌড়াইয়া আইলো। মাইয়াডা এলাকার এক রিকশাওয়ালা ছেমড়ার লগে ভাইগা গেছে। বাতেন মিয়ার মাথায় রক্ত উইটা গেলো। বাতেন মিয়া অফিসে গিয়া সারেরে কইয়া হেইদিন ছুটি লইয়া মাইয়ারে খুজতে গেলো। ডিঊইটিতে আমি আজিতন মিজান আর ছত্তার ডিউটিতে। রাইত বারোটা কি সারে বারোটার দিকে একটা লাশ আইলো হাসপাতালে। নাম পরিচয় নাই। খালের পাশে পইড়া আছিলো। পুলিসে তুইলা আনছে। কেউ নির্যাতন কইরা মাইরা রাইছে। পুলিশে লাশ মর্গে দিতে আইয়া কইতাছিলো গেং রেপ হেরপর গলায় ফাস দিয়া মার্ডার। ট্রলিতে কইরা লাশটা ঠেইলা ফ্রিজের রুমে নিয়া গেলাম। ফ্রিজে ঢুকানের সময় লাশের উপরে ঢাকনা দেওয়া পুরান বিছানার চাদরডা ঠিক কইরা দিতে গেলে মুখটা বাইর হইয়া যায়। আঁতকা আমি লাফাইয়া উডি। বাতেন মিয়ার মাইয়া! বাতেন মিয়ারে খবর দেয়ার লাইগা ফ্রিজ ঘর থিকা দৌড়াইয়া বাইরাই আর তহনই আমার মনে পরে পতিশধের কতা। এমনই ছিলো সবগুলা লাশ। এমনই মাইয়া মাইনশের শইল। আমার কি হইলো জানিনা। ফ্রিজ রুম থিকা বাইরাইয়া মিজান আর ছাত্তাররে বিচ্চাইতে লাগলাম। দেহি বিশ্রাম রুমে বইসা মদ গিলতাছে দুইডায়

মিজান জলদি আয় একটা মাল আইছে

মিজান আর ছাত্তার একসাথে কইলো

কই ?

ফ্রিজ রুমে রাইখা আইলাম মাত্র। মরছে বেশিক্ষন হয় নাই। শইল এহনো গরম। এক্কেবারে কচি বয়স। আর তেমুনই সুন্দর… জলদি যা লাশের আত্মীয় স্বজন কেউ আইলে আর সময় পাবিনা

মিজান আর ছাত্তার এক দৌড়ে ঘর থিকা বাইরাইয়া গেলো। আমি চৌকির উপর থ ধইরা বইয়া রইলাম। কতোক্ষন পর ঘর থিকা বাইরাইয়া গিয়া ফ্রিজ ঘরের জানালার ফাক দিয়া তাকাইলাম। দেহি মিজান বাতেনের মাইয়ার লাশের দুই পা ফাক কইরা পাগলের মতো আকাম করতাছে। আর ছাত্তার বাতেনের মাইয়ার মুখের মইধ্যে ওইডা ঢুকাইয়া গুতাইতাছে। আমি আবার বিস্রাম রুমে আইয়া পড়লাম। যান আমনের হোটেলের সামনে আইয়া পড়ছেন।

আলেয়া খালার দিকে তাকিয়ে আছি আমার পা কাঁপছে। কপালে ঘাম। মনে হচ্ছে আমি যেকোন সময় পড়ে যাবো। খেয়ালই করিনি যে আমি আমার হোটেলের কাছে চলে এসেছি। আলেয়া খালা আর তার স্বামী চলে যাচ্ছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি

আলেয়া খালা আপনি এখানে এলেন কেনো ?

আমার প্রশ্ন শুনে আলেয়া খালা একটু ঘুরে তাকালো।

বাতেনের মাইয়া এহনো আমারে খোজে। আমি বাতেনের মাইয়ার ভয়ে ওই জায়গা থুইয়া পলাইছি। আমরা যহন আইতাছিলাম তহন অয় একবার আইছিলো। আমাগো লগে লগে হাঁটছে কতোক্ষন।

মানে ?

আপনে বুঝবেন না। বিশ্বাসও করবেন না। না দেখলে কেউ বিশ্বাস করেনা।

আলেয়া খালা আর তার স্বামী হাঁটতে শুরু করলো। একবারও পেছন ফিরে তাকালো না। এতোসময় আমার সাথে তারা টর্চ জ্বালিয়ে হাটলেও এখন আর টর্চ জ্বালাচ্ছেনা। অন্ধকারে তাদেরকে দেখাও যাচ্ছেনা। আমি দ্রুত পায়ে হোটেলে ঢুকে পড়লাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published.