নয় নাম্বার প্লাটফর্ম

কিরে শুয়ারেরবাচ্চা কয়ডা ডাক দিছি কানে যায়না ?

কথাটা বলেই কুলি সর্দার বদরুল মিয়া চিকনার মাথায় একটা থাপ্পড় দিলো। দৃশ্যত চিকনাকে রেলস্টেশনের দক্ষিণ পাশের এই লোহার পিলারের সাথে আমরা বসে থাকা অবস্থায় দেখলেও চিকনা এখানে ছিলোনা। চিকনা যখন গাঁজায় দম দেয় তারপর অনেকটা সময় ও বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ায়। এই ঘুরে বেড়ানোটা পুরোটাই কাল্পনিক। যেমন এখন এই ব্যস্ত রেলস্টেশনে বসে বসে ও লক্ষ্মীর সাথে ফুলশয্যার কলাকৌশল নিয়ে ব্যস্ত ছিলো। বদরুলের থাপ্পড়টা ওকে আচমকা টান দিয়ে ফুলশয্যা থেকে ধুলশয্যায় নামিয়ে আনলো। তিরিক্ষী মেজাজে চোখ খুলে চিকনা একটা গালি দিতে গিয়েও বদরুলকে দেখে নিজেকে সামলে নিলো। কালা মাসুদ হলে গালিটা দিয়ে যুৎ পেতো চিকনা। আপাতত থাপ্পড় হজম করে তাকিয়ে রইলো বদরুলের দিকে।

কিরে আবার চাইয়া রইছোস ক্যান ? যা ওই লাগেজটা গাড়িতে তুইলা দিয়া আয়

বদরুল হাতের ইশারায় একটা লাগেজ দেখিয়ে দিলো। লাগেজের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে কেতাদুরস্ত এক ভদ্রলোক স্ত্রী সন্তান সমেত। চিকনা একটু আড়মোড় ভেঙে উঠে দাঁড়ালো। লাগেজটা হাতে নিয়ে ষ্টেশন থেকে বেড়িয়ে গেলো।

স্টেশনের সবচেয়ে নির্জন জায়গা হচ্ছে নয় নাম্বার লাইনের এই পাশটা। এখানে মূলত নষ্ট ইঞ্জিন আর নষ্ট বগিগুলো ফেলে রাখা হয়। আর এসব অকেজো জিনিশের স্তুপ জমতে জমতে কখন যে নয় নাম্বার লাইনটাই বন্ধ হয়ে গেছে এই বিষয়টা কেউই খেয়াল করেনি। এখন এখানে মূলত স্টেশনের কুলি টোকাই পকেটমার বারবনিতাদের আখড়া হয়ে উঠেছে। ওদের যতো আড্ডা আর কুকর্মের পরিকল্পনা সবকিছু এই নয় নাম্বারে ফেলে রাখা বগিগুলোতেই। সন্ধ্যা নামার মুখে এই সময়টাতে এখানে তেমন কেউ থাকেনা এটা হচ্ছে রাজধানী এক্সপ্রেস টার্মিনালে আসার সময়। এই সময়টাতেই যাত্রীদের ভীর সবচেয়ে বেশি হয়। আর তাই এই সময়টাতেই কুলি পকেটমার সবাই কর্মব্যস্ত হয়ে পড়ে।

নয় নাম্বার লাইনের পাশে ফেলে রাখা রাজশাহী এক্সপ্রেসের ভাঙা ডিপো থেকে বেড়িয়ে এলো লক্ষ্মী। লক্ষ্মী নামতে নামতে সেলোয়ারের ফিতাটা বেঁধে নিলো ওড়নাটা ঠিক করে নিলো। পেছন পেছন বেড়িয়ে এলো আমজাদ মিয়া। আমজাদ মিয়ার গায়ে রেল পুলিশের পোষাক। রেল পুলিশের সাব ইনস্পেকটর আমজাদ মিয়া। আমজাদ মিয়া দায়িত্ব পালনে খুবই সচেতন। তার চোখ এড়িয়ে এই স্টেশন থেকে একটা পিঁপড়েও বের হতে পারেনা। তবে আমজাদ মিয়ার হাতে কিছু গুজে দিলে স্টেশন থেকে হাতিরাও নির্বিঘ্নে পাড় হয়ে যেতে পারে। প্যান্টের জিপার আটকাতে আটকাতে আমজাদ মিয়া দ্রুত পা ফেলে চলে যাচ্ছিলো। লক্ষ্মী আমজাদ মিয়ার হাত চেপে ধরে

আমজাদ ভাই টাহা দিবেন না ?

ধুরও মাগী, এখন জালাইস না তো। গাড়ি ঢোকার সময় হয়ে গেছে। খালি টাকা টাকা… যা যা কামে যা

আমজাদ মিয়া চলে যায়। লক্ষ্মী আমজাদ মিয়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ষ্টেশনের দিকে হাঁটতে শুরু করে।

লক্ষ্মী এই স্টেশনের সবচেয়ে জনপ্রিয় যৌনকর্মী। জনপ্রিয় মানে ওর ডিমান্ড অন্যদের তুলনায় বেশি। যেখানে ফাহিমা শান্তাদের একবার শরীর শেয়ার করার জন্য রেট হচ্ছে এক’শ টাকা সেখানে লক্ষীর দের’শ টাকা ফিক্সড। অন্যদের তুলনার ওর গায়ের রংটা ফর্সা। নাকটাও খাঁড়া। শরীরে আগে একটু বাড়তি মাংশ থাকলেও ইদানীং কিছুটা শুকিয়েছে। অবশ্য শুকানোর পড়ে নিজের ডিমান্ড আরো বেড়েছে বলেই ধারণা লক্ষীর। চিকন আলীর স্বপ্নের নায়িকা লক্ষ্মী। চিকন আলী নেশা করুক আর যাই করুক স্টেশনে লক্ষ্মী ঢোকা মাত্রই চিকন আলীর নজর আঁটকে যায় লক্ষ্মীর দিকে। সেইসময়ে কেউ যদি চিকন আলীকে বিশ টাকার কাজের জন্য একশ টাকা দেবার প্রস্তাব দেয় তবুও কারো সাধ্য নেই চিকন মিয়াকে লক্ষ্মীর সামনে থেকে দূরে নেয়।

লক্ষ্মী দাঁড়িয়ে আছে দু নাম্বার প্লাটফর্মে। একটা পিলারের পাশে হেলান দিয়ে। খদ্দেরদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে। লক্ষ্মীর সামনেই এক নাম্বার প্লাটফর্মের ফ্লোরে পিলারের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে চিকন আলী। দুজনার মাঝখান দিয়ে রেললাইন। চিকন আলীর চেহারার অভিব্যক্তিতে কোন পরিবর্তন ঘটে না। নির্মোহভাবে কেবল লক্ষ্মীর দিকে তাকিয়ে থাকে চিকন আলী। ওর কেবল লক্ষ্মীর দিকে তাকিয়ে থাকতেই ভালো লাগে। লক্ষ্মী রঙডঙ করে কাস্টমারে সাথে কথা বলে। ঠোঁটে সুন্দর করে লিপিস্টিক দেয়। যেদিন শাড়ি পড়ে সেদিন শাড়িটাকে কোমরের কাছে সুন্দর করে পেঁচিয়ে রাখে। তখন লক্ষ্মীর কোমরে একটা ভাঁজ পড়ে। এইসব কিছুই ভালো লাগে চিকন আলীর।

চিকন আলী তাকিয়ে আছে। দুই একবার লক্ষ্মীর সাথে চোখচোখি হয়। লক্ষ্মী একবার মুচকি হাসে। চিকন আলীর মুখেও ঝুলে পড়ে কৃতজ্ঞতায় বিগলিত হাসি। লক্ষ্মী চিকন আলীর দিকে তাকিয়ে হেসেছে এরচেয়ে বড়  সুন্দর চিকন আলীর জীবনে নেই। লক্ষ্মী প্লাটফর্মের কিনারে এসে দাঁড়ায়। যেখানটায় ট্রেন এসে থামে ঠিক সেই জায়গায়টায়। চিকন আলীর দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু জোরেই বলে

কিরে তোর কোন কাম কাইজ নাই ? খালি আমারে দেকলেই পেট ভরবো ?

চিকন আলী হাসে। হাসির সময় ওর গালের পাশ দিয়ে একফোঁটা লালা চুইয়ে পড়ে।

কিরে কথা কস না কেন ? যা কামে যা…

চিকন আলী বুঝতে পারে এখন এখান থেকে লক্ষ্মী অন্য প্লাটফর্মের দিকে চলে যাবে। তাই মুখ খোলে

তুই আমারে বিয়া করবি ?

চিকন আলীর এই কথাটা শুনলে আগে লক্ষ্মী হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাবার যোগার হতো। কিন্তু বহুবার শুনতে শুনতে এখন হাসির দমক কমে এসেছে। লক্ষ্মী চোখে নাচন তুলে বলে

বিয়া করইন্না টেকা আছে তোর ? বিয়া করলে মাজায় জোর লাগে। তুই তো মাজা সোজা কইরা খারাইতেই পারোস না… মাজায় জোর না থাকলে বিয়া কইরা কি করবি…।

কথাটা বলেই লক্ষ্মী হাসতে শুরু করে। লক্ষ্মী জানে এখন চিকন আলী কি করবে। চিকন আলী লক্ষ্মীর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায়। আর একবারও লক্ষ্মীর দিকে তাকায় না। বাঁ পা’টা একটু টেনেটেনে হেঁটে চলে যায় বিপরীত দিকে। চিকন আলীর বাঁ পা’টা আহত তবে এই মুহুর্তে ওর পায়ের চেয়ে মনটা বেশি আহত। লক্ষ্মী জানে এখন চিকন আলী সোজা নয় নাম্বারের দিকে চলে যাবে। গিয়ে বসে বসে গাঁজা অথবা ড্যান্ডি নেবে।

দুই

চিকন আলীদের আসরটা প্রতিদিন নয় নাম্বারে বসেনা। মাঝেমাঝে স্টেশনে কোন বড় অফিসার আসলে আমজাদ মিয়া আগেই ওদেরকে জানিয়ে দেয় যাতে নয় নাম্বারে আড্ডা না দেয়। বড় অফিসারদের মতিগতির কোন ঠিক নাই। কখন কোন দিকে পরিদর্শনে এসে পড়ে। যেমন আজকে আমজাদ মিয়ার সিগনাল পেয়েই চিকন আলী, কালা মাসু্‌দ, ড্যান্ডি চুন্নু, আর নাটকা সালাম সবাই আসর জমিয়েছে স্টেশনের ওভার ব্রিজের নিচে। রাতের এই সময়টাতে পুরো স্টেশনের মধ্যে এই জায়গাটায় আলো কম আর মানুষের আনাগোনাও কম। তাই গাঁজায় দম দেবার জন্য এখানে আসর বসানোটাই নিরাপদ। চুন্নু একমনে বসে বসে হলিউড ব্র্যান্ডের সিগারেটের মধ্যে দেশী গাঁজা ভরছে। আর স্টিক বানিয়ে সামনে সাজিয়ে রাখছে। মাসুদের হাতে স্টিক জ্বলছে। মাসুদ দুইটা টান দিয়েই স্টিকটা সালামের দিকে বাড়িয়ে দেয়। চিকন আলী চোখ বন্ধ করে ঝিমাচ্ছে। মাসুদ ডান পা’টা সোজা করে একটা লাথি মারে চিকন আলীর উরুতে

হালায় খালি ঝিমায়

চিকন আলী চোখ খুলতেই দেখে ওর দিকে গাঁজার স্টিক বাড়িয়ে ধরে রেখেছে সালাম। চিকন আলী স্টিকটা হাতে নিয়ে একবার কপালে ঠেকায় তারপর টানতে শুরু করে। চুন্নু স্টিক বানাতে বানাতেই চিকন আলীর দিকে একবার তাকায়। তারপর সালামের দিকে তাকিয়ে বলে

চিকইন্না হালায় বাদ হইয়া গেছে। সারাদিন ওই রেন্ডির পিছে ঘোরে

চিকন আলী ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে একটু উদাস ভঙ্গীতে বলে

রেন্ডি হইলেও লক্ষ্মী সবার লাহান না। অর মনডা ভালা

চিকন আলীর কথা শুনে পান খাওয়া দাঁতগুলো বের করে হেসে ওঠে মাসুদ

হালায় তো ভোদাই খালি চাইয়া চাইয়া লক্ষ্মীরে দেহে। আরে বেডা মাইয়া মাইনশের মন থাহে জিব্বায়। খালি কিছু খাওয়াবি… দুই চাইরডা লিবিস্টিক চুড়ি কিন্না দিবি দেখবি তোর পিছে পিছে ঘুরবো

চিকন আলী মাসুদের কথার জবাব দেবার জন্য মুখ কিছুটা হা করে পুনরায় মুখটা বন্ধ করে ফেলে। একটু দূরেই একটা ল্যাম্পপোষ্টে নিচে দুইটা কুকুর যৌনবিলাসে মগ্ন। চিকন আলী উদাস ভাবে সঙ্গমরত কুকুর দুইটার দিকে তাকিয়ে থাকে।

তিন

বস্তির ঝুপড়ী ঘরের মধ্যে চৌকিতে শুয়ে আছে লক্ষ্মী। দুদিন ধরে জ্বর। সকালে দুইটা নাপা খাবার পর জ্বর ছেড়েছিলো কিন্তু এখন আবার বাড়ছে। দুপুরের ভ্যাঁপসা গরমেও কাঁথা গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে লক্ষ্মী। অনেকবার ঘুমে একটু একটু চোখটা লেগে আসলেই বাহিরে মোকসেদ মিয়ার ঝগড়াটে বউয়ের চিল্লানীতে ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছে। সকাল থেকেই থেকে থেকে চিল্লাচ্ছে। প্রথমে শুরু করেছিলো মোকসেদ মিয়ার সাথে এখন সেই চিল্লানি কলতলায় বিন্দির মায়ের সাথে চলছে। মোকসেদ মিয়ার বৌয়ের চিল্লানীতে এই বস্তির সবাই অতিষ্ট হলেও কেউই প্রতিবাদ করার সাহস পায়না। কারণ মোকসেদ মিয়া হচ্ছে পুলিশের টিকটিকি। রেললাইনের পাশ ঘেঁসে একসারি বাঁশের বেড়ার উপর টিনের ছাউনি দেয়া ঘর। সর্বসাকুল্যে দুইশ পঁচিশটা ঘর। সরকারী জমি হলেও মাগনা থাকার সুযোগ নেই। মাসে এলাকার পার্টি অফিসের পোলাপানকে দিতে হয় ঘর প্রতি চারশ পঞ্চাশ টাকা। আর পুলিশকে একহাজার টাকা। তার উপরে বিভিন্ন বাহানা ধরে পুলিশ যখন বস্তিতে অভিযানে আসে তখন দিতে হয় বাড়তি টাকা। লক্ষ্মী পাশ থেকে একটা তেল চিটচিটে বালিশ তুলে নিজের মাথা চাপা দেয়। যাতে মোকসেদ মিয়ার বউয়ের চিৎকার শুনতে না হয়। এমন সময় লক্ষ্মীর কানে আসে কেউ একজন দরজার সামনে আস্তে আস্তে ডাকছে

লক্ষ্মী আছোস এই লক্ষ্মী ঘরে আছোস

লক্ষ্মী প্রথমে ডাকটা কি বাস্তব নাকি জ্বরের ঘোরে ভুল শুনছে সেটা বুঝতে পারেনা। আস্তে আস্তে বুঝতে পারে এটা চিকন আলীর গলা। মাথার উপরের বালিশটা সরিয়ে দরজার দিকে ফেরে।

কিরে চিকইন্না কি হইছে ? চিল্লাস কেন

চিকন আলী ঘরের দুয়ারটা ভেতরে ঠেলে দিয়ে মাথাটা ঘরের ভেতর এগিয়ে দেয়

তোরে খুঁজতে আইলাম

লক্ষ্মী কোন উত্তর করেনা। চোখ বন্ধ করে থাকে। চিকন আলী ঘরে ঢুকে লক্ষ্মীর চৌকির পাশে এসে দাঁড়ায়

কি হইছে তোর। এহন হুইয়া রইছোস

লক্ষ্মী চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। চিকন আলী একবার ঘরের চারদিকে তাকায়। তারপর লক্ষ্মীর মুখটা দেখে। আস্তে আস্তে নিজের ডান হাতটা লক্ষ্মীর কপালে রাখে

কিরে তোর দেহী জর আইছে।

লক্ষ্মী চোখ বন্ধ রেখেই বলে

দুইদিন হইলো

হের লাইগাই তো তোরে ষ্টেশনে দেহিনাই দুইদিন। আমি তোরে খুঁজছি

কথার শেষটুকুতে এসে চিকন আলীর গলার স্বর নেমে যায়। অনেক সাহস করেও সেটাকে একই স্বাভাবিক মাত্রায় উচ্চারণ করতে পারেনা চিকন আলী। ধীরে ধীরে চিকন আলী লক্ষ্মীর মাথার কাছে বসে। বসে লক্ষ্মীর মাথায় হাত রাখে। চুলের মধ্যে হাত বুলায়

ওষুধ খাইছোস ?

হ খাইছি

চিকন আলী আর কথা খুঁজে পায়না। লক্ষ্মীর মাথায় হাত বুলায়। লক্ষ্মীর চুল থেকে একটা ঘ্রাণ এসে চিকন আলীর নাকে লাগে। চিকন আলী বুঝতে পারেনা এটা তেলের গন্ধ নাকি লক্ষ্মীর চুলের গন্ধ। ওর খুব ইচ্ছে করে লক্ষ্মীর চুলে নাক লাগিয়ে একটু ঘ্রাণ নিতে। লক্ষ্মী মাথাটা একটু নাড়িয়ে আরেকটু চিকন আলীর কোল ঘেঁসে মাথাটা রাখে। কেউ একজন মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে এই বিষয়টাকেই চোখ বন্ধ করে অনুভব করতে চায় লক্ষ্মী

লক্ষ্মী তোরে একটা কতা কই

তুই আমারে বিয়া করবি

কথাটা শুনেই লক্ষ্মী চোখ মেলে চিকন আলীর দিকে তাকায়। চিকন আলী কি বলবে বুঝতে পারেনা

তুই চাইস না। তুই ঘুমা

লক্ষ্মী হারামজাদা গুইরাফিররা হেই হাঙগার আলাপ। বাইড়া আমার ঘরের থিকা

চিকন আলী উঠে দাঁড়ায়। অপরাধী ভঙ্গিতে এদিক সেদিক তাকায়

আইচ্ছা আমি যাইগা তুই ঘুমা

খালি বিয়া বিয়া… জানোস বিয়া করতে কতো টাহা লাগে

চিকন আলী কোন কথা না বলেই স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়।

চার

অনেক সময় ধরে চিকন আলী কালো চামড়ার উপর সাদা সুতার ফুলতোলা মানিব্যাগটার দিকে তাকিয়ে আছে। মাত্র যে দক্ষিনী লোকাল ট্রেনটা এলো সেটা থেকেই নেমেছে লোকটা। সাথে স্ত্রী ও সাত আট বছরের মেয়ে। স্ত্রী কি কারণে মুখ ভাড় করে ঠিক ষ্টেশনমাস্টারের রুমের দরজার কাছটায় গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেটা চিকন আলী ঠিক বুঝতে পারেনা। আর যে বিষয়টা চিকন আলী বোঝেনা সেটা নিয়ে ও ভাবতেও চায়না। তারচেয়ে আপাতত মানিব্যাগটা নিয়ে ভাবাটাই যৌক্তিক মনে হয়। একবার চারদিকটা দেখে নেয়। লোকটা মেয়েকে প্লাটফর্মের বেঞ্চে বসিয়ে পায়ের জুতোটা পড়িয়ে দিচ্ছে। সাদা সুতার ফুলতোলা মানিব্যাগটা প্যান্টের পেছনের পকেট থেকে কিছুটা বেড়িয়ে আছে। চিকন আলী আর ডান বাম না তাকিয়ে হনহন করে লোকটার দিকে হাঁটতে শুরু করে। হাঁটতে হাঁটতেই আচমকা লোকটার পেছনে গিয়ে ধাক্কা খায় চিকন আলী। লোকটা মেয়ের উপর পড়তে পড়তে বেঞ্চের হেলানির সাথে হাত ঠেকিয়ে নিজেকে সামলে নেয়। সোজা হয়ে ঘুরে পেছনে তাকাতেই ভিড়ের মধ্যে আর কাউকে নিশ্চিত ভাবে বুঝতে পারেনা। কে ধাক্কা দিলো সেটা না বুঝেই একটা ভদ্রলোকি খিস্তি দেয়। অবশ্য খিস্তিটা চিকন আলীর কান পর্যন্ত পোঁছায় না। কেননা তার আগেই চিকন আলী ওভারব্রিজটার সিঁড়ির মুখে পৌঁছে গেছে। ওভারব্রিজের একদম উপরে মাঝামাঝি জায়গাটায় যাবার আগে চিকন আলী আর পেছন ফেরে না। মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকিয়ে একটা লম্বা নিঃশ্বাস ছাড়ে। এখান থেকে সোজা দেখা যাচ্ছে সেই লোকটা তার অভিমানী স্ত্রীর মান ভাঙাতে চেষ্টা করছে। নিজের দুইকান ধরে লোকটা কিছু বলছে। পাশে দাঁড়িয়ে মেয়েটা হাততালি দিয়ে হাসছে। দৃশ্যটা চিকন আলীর ভালো লাগে। ইচ্ছে করে আরেকটু দাঁড়িয়ে দেখে। কিন্তু ওস্তাদের নিষেধ আছে হাতসাফাইয়ের পর সেই জায়গায় আর থাকতে নেই। নিজের পকেট থেকে সাদা ফুলতোলা মানিব্যাগটা বের করে। মানিব্যাগ খুলতেই দুইটা পাঁচশ টাকার নোটের কিছু খুচরো টাকা বেড়িয়ে আসে। চিকন আলী টাকাগুলো পকেটে ঢুকিয়ে মানিব্যাগটা ফেলে দেয়। মানিব্যাগে নাম লেখা থাকে, টাকায় কারো নাম লেখা থাকেনা। চিকন আলী ওভারব্রিজের বিপরীত দিকে হাঁটতে থাকে।

পাঁচ

লক্ষ্মী আজকে চারদিন পর কাজে এসেছে। আজকেও শরীরটা ঠিক যুৎ লাগছিলো না। কিন্তু হাতের টাকা পয়সা একদম শেষ। না এসে উপায় নেই। আর যেই শরীরের ভাঁজে ভাঁজে ভাগ্য লেখা থাকে সেই শরীরের এতো আহ্লাদ মানায় না। এটা ভেবেই বিকেলে রোদটা একটু পড়তেই লক্ষ্মী বেড়িয়ে চলে এসেছে প্লাটফর্মে। আয়নালের চায়ের দোকান থেকে একটু আগেই একটা চা আর বনরুটি খেয়ে আবার এসে এখানে দাঁড়িয়েছে লক্ষ্মী। হাতে টাকা থাকুক না থাকুক চা রুটি কলা এসব হালকা খাবারের জন্য চিন্তা করতে হয়না লক্ষ্মীর। আয়নালের দোকানে লক্ষ্মীর খাওয়া ফ্রি। শুধু সাপ্তাহে একদিন রাতে মানুষের ভীর একটু কমে এলে দেখা যায় আয়নাল দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করতে করতে লক্ষ্মী গিয়ে টুপ করে আয়নালের ঝাঁপের ভেতর ঢুকে যায়। আধ ঘন্টা পর ঝাঁপের এক ফাঁকা দিয়ে বেড়িয়ে আসে লক্ষ্মী। সেদিন রাতে ছোট দোকানটার ভেতর হাত পা ছড়িয়ে ঘুমোতে না পারার দুঃখ ভুলে গুটিসুটি হয়ে আয়নাল শান্তিতে ঘুমায়।

লক্ষ্মী চারদিকে তাকায়। আগ্রহী চোখ খোঁজে। এমন সময় দেখা যায় দূর থেকে শার্টের অবশিষ্ট দুইটা বোতাম লাগিয়ে মাথার ধুলো মাখা লালচে চুলের সিঁথি ঠিক করতে করতে হন্তদন্ত হয়ে আসছে চিকন আলী। চিকন আলীকে দেখে লক্ষ্মীর ঠোঁটে একটু হাসি খেলে যায়। চিকন আলী সামনে এসে দাঁড়িয়ে একটু হাঁপিয়ে নেয়। লক্ষ্মী চিকন আলীর চুলের সিঁথির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে

কিরে এমুন দৌড়াইয়া দৌড়াইয়া কই যাস

তোর কাছেই আইলাম

কেন

ল তোরে বিয়া করমু

তোরে বিয়া করবো কে ?

তুই করবি। তুই না কইছোস বিয়া করতে টেকা লাগে। আমার কাছে টেকা আছে। ল বিয়া করমু

কয় টেকা আছে ?

চিকন আলী প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেয়। পাঁচশ টাকার দুইটা নোটসহ কিছু টাকা বের করে আনে

দেখ অনেক টাহা আছে

লক্ষ্মী হাত বাড়িয়ে টাকাগুলো নেয়। গুনে দেখে। লক্ষ্মীর ঠোঁটে বিদ্রূপের হাসি খেলে যায়।

এইহানে তো হুদা তেরোশো আডারো টাহা। এই টাহা দিয়া বিয়া করবি ?

হ করমুই তো

লক্ষ্মী আর চিকন আলীর কথা থেমে যায়। মাঝখানে ঢুকে পড়ে একজন আগন্তুক। ঢুকে পড়ে আবার ঠিক ঢুকে পড়েনা। একটু দূরে দাঁড়িয়ে লক্ষ্মীকে চোখের ইশারা করে। লক্ষ্মী আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে আছে। একটা গামছা কাঁধে। কালো একটা ময়লা প্যান্ট আর লাল একটা গেঞ্জি গায়ে। হয়তো কোন ট্রাক চালক হবে। ধারণা করে নেয় লক্ষ্মী। লক্ষ্মী হাতের আঙুল দেখিয়ে বুঝিয়ে দেয় ফিক্সড রেট। আগন্তুক রাজি হয়। লক্ষ্মী ঘুরে দাঁড়িয়ে নয় নাম্বারের দিকে হাঁটতে শুরু করে। লক্ষ্মীকে ফলো করতে থাকে আগন্তুক। চিকন আলী রাগে ফুঁসছে। কিন্তু ওর রাগটা ও কখনোই সঠিক মাত্রায় প্রকাশ করতে পারেনা। আর সেটা লক্ষ্মীর সামনে তো অবশ্যই না। চিকন আলী একটু দ্রুত পা ফেলে লক্ষ্মীর পাশে পাশে হাঁটে

তুই আমারে বিয়া করবি না লক্ষ্মী ?

লক্ষ্মী সামনের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই জবাব দেয়

তুই আমারে বিয়ার চিন্তা মাতার তে বাদ দে… তোরে বিয়া করমু না

চিকন আলী থমকে যায়। লক্ষ্মী এগিয়ে যাচ্ছে। চিকন আলীকে পাড় করে লক্ষ্মীর আগন্তুক খদ্দের লক্ষ্মীর পেছনে যেতে থাকে। কিছু একটা ভেবে নিয়ে চিকন আলী আস্তে আস্তে ফের লক্ষ্মীর পেছনে হাঁটতে থাকে। লক্ষ্মী হাঁটছে । লক্ষ্মীর পেছনে হাঁটছে খদ্দের। খদ্দেরের পেছনে চিকন আলী।

লক্ষ্মী নয় নাম্বারে ফেলে রাখা রাজশাহী এক্সপ্রেসের বগির মধ্যে ঢুকে যায়। লক্ষ্মীর পেছন পেছন বগিতে ঢুকে যায় খদ্দের। চিকন আলীর হাঁটার গতি আস্তে আস্তে শ্লথ হয়ে আসে। নয় নাম্বারের শেষ পিলারটার সাথে হেলান দিয়ে বসে পড়ে। এখান থেকে রাজশাহী এক্সপ্রেসের পরিত্যাক্ত বগিটা খুব স্পষ্ট। চিকন আলী একদৃষ্টিতে বগিটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ জ্বালা করে। ভদ্রপল্লির মানুষের মতো চিকন আলীদের যেহেতু কান্নায় কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। কাঁদলে ওদের সম্মানহানি হয়না। তাই আমরা দেখতে পাই সদ্য জ্বলে ওঠা প্লাটফর্মের সিগনাল লাইটের আলোতে চিকন আলীর দুই চোখে দুইটা জলের ফোটা চিকচিক করে ওঠে।

ছয়

গতরাতে নয় নাম্বার প্লাটফর্মের শেষ পিলারটার সাথে কখন যে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলো চিকন আলী সেটা ও জানেনা। ঠিক তখনই ব্যাপারটা জানতে পারলো যখন আনসার এসে চিকন আলীকে একটা লাথি দিয়ে জাগিয়ে দিলো। লাথিটা একটু বেজায়গায় লেগে গেছে। বুকের ডান পাশটা এই দুপুরবেলাতেও ব্যথা করছে। হাঁটতে হাঁটতে চিকন আলী আয়নালের টি স্টলে এসে বসে। বসতে বসতেই চিকন আলীর দুইটা কথা মনে পড়ে। প্রথম মনে হয় যে অতিরিক্ত চিনি দিয়ে এককাপ চা খেতে পারলে ভালো লাগতো। তারপরেই দ্বিতীয়ত মনে হয় যে এইসময়ে ঘন্টাদুই আয়নালের দোকানে চা বন্ধ থাকে। চারপাশে তাকিয়ে অন্য চায়ের দোকানের দিকে চোখ বুলাতে গিয়েই চিকন আলী দেখতে পায় তার দিকেই হেঁটে আসছে ড্যান্ডি চুন্নু। চিকন আলী দোকানের সামনে পাতা কাঠের বেঞ্চে বসে। কাছাকাছি এসেই ড্যান্ডি চুন্নু হাঁক দেয়

কিরে চিকনা কাইলকা কই আছিলি ?

আছিলাম… ক্যা কি হইছে

কাইলকা তো কালা মাসুদরে পুলিশে ধইরা লইয়া গেছে

ও আইচ্ছা

চিকন আলীর অভিব্যক্তি দেখে বোঝার উপায় নেই যে পুলিশে ধরে নিয়ে যাওয়াটা কোন আলোচনার বিষয় হতে পারে কিনা । পুলিশকে চাঁদা দিতে না চাওয়া। ছোটখাটো চুরি প্রমাণ হয়ে গেলে। বাঁ গাঞ্জা খেয়ে পুলিশের সাথে খিস্তি করলে এই ধরাধরিটা চলতেই থাকে। ওসব থানা পেড়িয়ে কখনো আদালতে পৌঁছায় না। কিছু টাকা পয়সা রেখে থানার লকাপ থেকেই ছেঁড়ে দেবে এটা সবাই জানে। চিকন আলী চোখ বন্ধ করে একটু ঝিমায়। ড্যান্ডি চুন্নু ধুলো ময়লার আস্তরণে আচ্ছাদিত থ্রি কোয়াটার প্যান্টের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে কিছু একটা খোঁজে। তারপর একটা পলিথিনের পুঁটলি বের করে। চলে যেতে নিয়েও আবার চিকন আলীর দিকে  ঘুরে দাঁড়ায়। চিকন আলীর কানের কাছে একটু ঝুঁকে আসে

চিকইন্না হালা আর কতো ঝিমাবি ? জানোস আইজগা একটা কাম করছি

চিকন আলী মাথা তুলে ড্যান্ডি চুন্নুর দিকে তাকায়। চিকন আলীর উৎসাহী চোখ চিকচিক করে ওঠে

কি করছোস ?

চুন্নু ফিসফিস করে

আইজগা লক্ষ্মীরে লাগাইছি… হেব্বি মাল মামা

চিকন আলীর চোখের চিকচিক ভাবটা মুহুর্তে উধাও হয়ে যায়। ড্যান্ডি চুন্নুর দিক থেকে চোখটা সরিয়ে নেয়। চুন্নু আবার ফিসফিস করে

আমার থিকা পঞ্চাশ টেকা কম নিছে

চিকন আলীর আর সহ্য হয়না। চিৎকার করে ওঠে

তোরে আমি জিগাইছি কিছু ? এইডি আমারে কস ক্যা ?

তুই চিল্লাইতাছোস কে ? হালার পো তুই তো ওর পিছেই ঘোরোস

চিকন আলী চুন্নুর গেঞ্জির কলার চেপে ধরে।

তো আমি কের পিছে ঘুরমু হেইডা দিয়া তোর কাম কি ?

এ ভাগ এহান তে। বাইঞ্চোদেরা এই দোকানের সামনেই আহে মরতে। যা ব্যবসা করতে দে

আয়নাল মিয়ার ধমক খেয়ে দুজনেই আয়নাল মিয়ার মুখের দিকে তাকায়। চিকন আলী ড্যান্ডি চুন্নুর গেঞ্জি ছেঁড়ে দেয়। চুন্নু গেঞ্জি ঠিক করতে করতে আস্তে আস্তে পা চালিয়ে দূরে চলে যায়। যেতে যেতে চিকন আলীর দিকে তাকিয়ে খিস্তি দেয়

হালা মাউল্লা একটা খানকির পিছে ঘোরে। খানকিও ওরে পাত্তা দেয়না আর এইহানে বইয়া আবার ভাব লয়…

চুন্নু চলে যায়। চিকন আলী বেঞ্চ থেকে একটু উঠেই আবার আস্তে আস্তে বসে পড়ে। কয়েক পলক বসেই আবার উঠে দাঁড়িয়ে নয় নাম্বারের দিকে হাঁটতে শুরু করে।

সাত

নয় নাম্বারের রাজশাহী এক্সপ্রেসের ভাঙ্গা বগির ভেতরে বসে নিজের মেকাপটা ঠিক করে নিচ্ছে লক্ষ্মী। একটু আগে বাণিজ্যের ধকলে লিপস্টিকের সাথে গালের ঘাড়ের পাউডার গুলোও মুছে গেছে। কিছু কাস্টমার থাকে বুনো ষাঁড়ের স্বভাবের। এরা যখন আসে তখন সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে যায়। শেষ কাস্টমারটাও তেমন। হাতের কনুইতে লেগেছে। কিছুটা চামড়াও ছিলে গেছে। শুরুতে লক্ষ্মীর মেজাজ খুব খারাপ থাকলেও এখন অনেকটা ভালো লাগছে। পুলিশের ভয় দেখিয়ে কাস্টমারের কাছ থেকে একশ টাকা বেশি রাখা গেছে এটাই আপাতত লক্ষ্মীর শারীরিক কষ্ট ভুলে থাকার কারণ। ঠোঁটে ভারি করে লিপস্টিক দিয়ে মাত্রই হাতের কনুইতে একটু থুঃ থুঃ লাগাচ্ছিলো লক্ষ্মী। এমন সময় সেখানে আসে চিকন আলী। এসে লক্ষ্মীর থেকে হাত তিনেক দূরে দাঁড়ায়। লক্ষ্মীর পায়ের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েই থাকে। লক্ষ্মী প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়

কি রে কি হইছে খারাইয়া রইছোস ক্যা ? কিছু কইবি ?

চিকন আলী সোজা লক্ষ্মীর চোখের দিকে তাকায়। চিকন আলী কিছুটা হাঁপাচ্ছে। তাই কথা বলার সময় কণ্ঠ কিছুটা কেঁপে ওঠে। কাঁপাকাঁপা গলায় চিকন আলী বলে

তোর লগে আমার কতা আছে

কামে যাইমু ।কি কইবি জলদি ক

তুই আমারে বিয়া করবি ?

লক্ষ্মী হেসে ওঠে

আবার তোর বিয়ার বাই উঠছে

চিকন আলী ক্ষিপ্রভাবে দুই পা এগিয়ে এসে লক্ষ্মীর গলা চেপে ধরে

হাসোস কে ? তোর কিয়ের এতো দেমাগ ? সবাইর লগে হুইতে পারোস আর আমারে বিয়া করতে পারোস না , তোর এতো দেমাগ কিয়ের

ছাড় চিকইন্না ব্যতা পাইতাছি কিন্তু

লক্ষ্মী একটা ঝাড়া দিয়ে চিকন আলীর হাতটা ছাড়াতে চেষ্টা করে। কিন্তু হাতগুলো লোহার বেড়ীর মতো গলায় আটকে আছে। চিকন আলীর এই চেহারা কখনো দেখেনি লক্ষ্মী। দ্বিতীয়বার হাত ছাড়াবার চেষ্টা না করে চিকন আলীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। চিকন আলী আবার চিৎকার করে

তুই একটা রাস্তার বেশ্যা তোর এতো দেমাগ কিয়ের ? তোর লাইগা চুন্নু অরা আমারে লইয়া মজা নেয়। তুই বলে আমারে পাত্তা দেস না

এমন সময় নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয় লক্ষ্মীর। চোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে। প্রাণপণ ধাক্কা দিয়ে চিকন আলীর হাত থেকে গলা মুক্ত করতে চায়। চিকন আলী গলা ধরেই ধাক্কা দেয় লক্ষ্মীকে। লক্ষ্মী বগির ভাঙ্গা সিটের লোহায় ধাক্কা খেয়ে ফ্লোরে পড়ে যায়। চিকন আলী একলাফে লক্ষ্মীর পেটের উপর উঠে বসে আবার লক্ষ্মীর গাল চেপে ধরে

ক তোর এতো দেমাগ ক্যা ? আইজগা তোর দেমাগ দেখমু

লক্ষ্মী আর প্রতিবাদের বা প্রতিরোধের শক্তি পায়না। শারীরিক শক্তি অনেক আগেই হারিয়েছে লক্ষ্মী। মানসিক যে শক্তিটুকু নিয়ে এতোদিন লড়াই করেছে আজকে মনে হচ্ছে সেই শক্তিটুকুও ফুড়িয়ে গেছে। চিকন আলী দুইহাতের এক ঝাটকা টানে লক্ষীর ব্লাউজটা ছিঁড়ে ফেলে। লক্ষ্মী ফ্যালফ্যাল করে চিকন আলীর দিকে তাকিয়ে থাকে। চিকন আলী বা হাতটা দিয়ে লক্ষ্মীর সায়া সহ কাপড়টাকে টেনে কোমরের উপর তুলে ফেলে তখনো লক্ষ্মী ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। লক্ষ্মী ততোক্ষণ পর্যন্ত কেবল তাকিয়েই থাকে যতোক্ষন না চিকন আলী লক্ষ্মীর জরায়ুতে বীর্যপাত করে লক্ষ্মীর উপর থেকে গড়িয়ে না পড়ে।

বগির মধ্যেই জানালার নিচে ফ্লোরে বসে আছে চিকন আলী। বাহিরে তাকিয়ে আছে। হাঁটু পর্যন্ত কেটে থ্রি কোয়াটার বানানো প্যান্টটা কোমর পর্যন্ত ওঠানো। বুকের মাঝখান দিয়ে একটা চিকন ঘামের রেখা নেমে গেছে নাভি বরাবর নিচে। পাশেই বসে আছে লক্ষ্মী। ছেঁড়া ব্লাউজের সামনের দিকটা হা হয়ে আছে। ডানদিকের স্তনটা বেড়িয়ে আছে। কাপড়টা হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা। চুলগুলো এলোমেলো। একটু আগে ঠোঁটে দেয়া লিপস্টিক এখন গালে মেখে আছে। অনেকটা জয়নুল আবেদীনের দুর্ভিক্ষের ছবির মতো। নিজের পায়ের পাতার দিকে তাকিয়ে আছে লক্ষ্মী। কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছেনা। আপাতত ওরা একজন অপরজনের অস্তিত্ব অস্বীকার করতে পারলেই যেনো বেঁচে যায়। লক্ষ্মীই প্রথম মুখ খোলে

দেখ চিকন আলী তুই কইলি আমি বেশ্যা হ আমি তো বেশ্যাই, মাইনশের লগে হোয়াডাই আমার কাম। এই শইলডা লইয়া মাইনশে কি করলো হেইডা নিয়া ভাবিনা। অনেক বছর হইছে কেউ এই শইলডা নিয়া যা ইচ্ছা করলেও আমি কষ্ট পাইনা। কিন্তু আইজগা কষ্ট পাইছি। তুই যহন করতে ছিলি তহন কষ্ট পাইছি। হেই পত্থমবার যহন আমার নিজের আপন চাচা আমারে জোড় কইরা করছিলো তহন যেমন কষ্ট পাইছিলাম হেমন কষ্ট পাইছি।

কথা থামিয়ে লক্ষ্মী একটু জিরিয়ে নেয়। চিকন আলী আগের মতোই বসে আছে। লক্ষ্মী দুইটা বড় নিঃশ্বাস নিয়ে আবার বলতে শুরু করে

দেখ তোরে এতো বকা দেই হের পরেও আবার তোর লগে কতা কই ক্যা তুই জানোস ? তুই বিয়ার কতা কইলে আমি তোরে না কইয়া দেই। হেরপর আবার তোরে দেকলেই কতা কইতে ক্যান ডাকি জানোস ? ডাকি যাতে তুই আবার আইয়া আমারে বিয়ার কতা কস। তুই ছাড়া তো আমারে কেউ কোনদিন বিয়ার কতা কয় নাই। সবাই খালি হোওনের কতা কয়। তুই বিয়ার কতা কইলে আমার ভাল্লাগে। আমারও মন চায় তোরে বিয়া করি। সংসার করি… তোরে আমিও পছন্দ করি…

চিকন আলী মাথাটা ঘুড়িয়ে লক্ষ্মীর মুখের দিকে তাকায়। লক্ষ্মীর পুরো মুখটা দেখতে পায়না। লক্ষ্মী মুখটা ঘুরিয়ে চিকন আলীর দিকে তাকাতেই লক্ষ্মীর পুরো মুখটা দেখতে পায় চিকন আলী। লক্ষ্মীর দুই চোখের নিচে শুকিয়ে যাওয়া কান্নার রেখা। মরা নদীর মতো ভেসে আছে। লক্ষ্মী আবার মুখ খোলে

তোরে আমি বিয়া করতে চাই কিন্তু ক্যান করিনা জানোস ? আমার এইডস হইছে। তিনমাস আগেই জানছি। খালি পেটটা চালাইতে হইবো দেইখা এহনো এই কাম করি। আমি বেশিদিন বাচমু না। আর যেরা আমার লগে হোয় হেগোও এইডস হইবো… এর লাইগা তোরে বিয়া করতে রাজি হইনা…

লক্ষ্মী আর কোন কথা বলেনা। ক্লান্তভাবে ভাঁজ করে রাখা হাটুর উপর মাথাটা ঠেকিয়ে দেয়।

চিকন আলী আর লক্ষ্মীর মুখ দেখতে পায়না। লক্ষ্মীর কালো চুলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখে অন্ধকার দেখে চিকন আলী। চিকন আলীর মাথায় পাশাপাশি দুইটা ভাবনা সমানতালে খেলতে থাকে

একটা ভাবনা হচ্ছে

আইচ্ছা লক্ষ্মীও তাইলে আমারে পছন্দ করতো ? যেই লক্ষ্মী আমারে ভালা জানতো ওরে আমি জোর কইরা করলাম ? হের লাইগা লক্ষ্মী কানলো ?

আরেকটা ভাবনা হচ্ছে

আইচ্ছা এইডস রোগীর লগে করলে যদি এইডস হয় তাইলে কি এহন আমারও এইডস হইবো ? আমি কি মইরা যামু ?

চিকন আলীর নিজেকে খুব অসহায় অসহায় লাগে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.