বাচ্চাবউ

এক

বউ একটা কথা শোন, একটু এদিকে ফিরো-
ফিস ফিস করে কথাগুলো বললো তরুণ। কিন্তু ঊর্মি নির্বিকার। ওর কাছ থেকে আশানুরূপ প্রতিত্তর আসলো না, একইভাবে দেয়ালের দিকে মুখ ঘুড়িয়ে শুয়ে আছে সে। এবার তরুণ সাহসিকতার চূড়ান্ত পর্যায় পৌঁছে ওর দ্বিধাগ্রস্ত ডান হাতটা উর্মির কোমরে জড়ায়। কাছে টানে। মুহূর্তে ধাক্কা দিয়ে হাত সরিয়ে দেয় উর্মি
দেখ অনেক রাত হইছে- ঘুমাতে দাও, সারাদিন সংসার খেলতে খেলতে ক্লান্ত রাতে একটু ঘুমাবো তারও উপায় নেই। শুধু বিড়ালের মতো ছুক ছুক করো।
উর্মি দেখ তুমি এভাবে কথা বলো কেন? একটু হাসি মুখে দুইটা কথা বলবা তা না শুধু… থাক বাদ দাও
তরুণ উর্মির হাত ধরে। উর্মি ছাড়িয়ে দেয়
দেখ গরমে অসহ্য লাগছে। গায়ে হাত দিবানা বলছি।
তরুণ হাসে…

বউ এইটা আবহাওয়ার উত্তাপ না, তোমার যৌবনের উত্তাপ।

উর্মি মুহুর্তে বিছানায় সোজা হয়ে বসে
মুখের ভাষা ঠিক করো,  তোমার ভাষা আর রিকসাওয়ালার ভাষার মধ্যে কোন তফাৎ নাই
বিছানা থেকে একটা বালিশ আর কাঁথা মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে উর্মি
যাও ঐখানে গিয়ে শোও, এখানে শুয়ে তোমার উত্তাপ মাপার দরকার নাই। তুমি ফ্লোরে শোবা অন্যথায় আমি শুবো, বলো কি করবা?
তরুণ কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়, চোখ পরে উর্মির চোখে বিয়ের পর গত দুই বছরে উর্মির চোখের ভাষা পড়তে শিখেছে তরুণ। তাই মাঝরাতে আর চেঁচামেচি বাঁধাতে চায় না। চুপচাপ খাট থেকে নেমে পড়ে। ফ্লোরে পরে থাকা বালিশটা লাথি মেরে এক কোনায় ফেলে দেয়। লেখার টেবিলে গিয়ে বসে। টেবিল ল্যাম্প জ্বালায়। একবার ফিরে তাকায় উর্মির দিকে, উর্মি পূর্বের অবস্থা ফিরে গেছে। দেয়ালমুখী।
তরুণ টেবিলে রাখা গুস্তাভ ফ্লবার্ট এর ম্যাডাম বোভারি বইটা সামনে টেনে নেয়। বই সামনে খোলা রইলো। কিন্তু একটা শব্দও মাথায় ঢুকছে না। চিন্তাগুলো ছন্নছাড়া। তরুণ একজন কবি। কবি হিসেবেই পরিচিত। এই পরিচিতি আরো বেড়েছে গত তিন বছর আগে, যখন ওর কাব্যগ্রন্থ “এপিটাফে লেখা প্রেমপত্র” বর্ষসেরা বই হিসেবে পুরস্কার পায়। রাতারাতি আলোচনার  কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে তরুণ। সেই এওয়ার্ড প্রদান অনুষ্ঠানে প্রিয় কবিকে শুভেচ্ছা জানাতে এসেছিলো উর্মি।

উর্মি তখন সবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেছে। প্রিয় কবির হাতে এক তোরা লাল গোলাপ তুলে দিয়ে, “এপিটাফে লেখা প্রেমপত্র” কবিতার বইটা বাড়িয়ে দিয়েছিলো তরুণের দিকে। তরুণ অটোগ্রাফ দিয়ে লিখেছিলো “স্বপ্নময় রাত্রি আসুক দুঃসপ্নের ভীড়ে, নিমন্ত্রণ রইলো স্বপ্ন দেখার”। তরুণের দিক থেকে স্বপ্ন দেখার নিমন্ত্রণ অটোগ্রাফ অব্দি সীমাবদ্ধ ছিলো। বিশেষভাবে লক্ষ করেনি উর্মিকে। আর লক্ষ করার মতো পরিস্থিতিও ছিলো না অটোগ্রাফ শিকারিদের ভীরে। উর্মিও নিশ্চুপ বিদায় নিয়ে ছিলো। তারপর দু’ সপ্তাহের মতো সময় কাটে, একদিন তরুণের মোবাইলে ফোন করে উর্মি। কথা হয়। একজন ভক্তের সাথে একজন কবির গতানুগতিক কথোপকথন। পুনরায় কল করার অধিকার আদায় করে বিদায় নেয় উর্মি। তারপর প্রথাগত নিয়মে মুঠোফোন থেকে বন্ধুত্ব এক সময় বন্ধুত্বের মুগ্ধতা ছাড়িয়ে প্রেমে পড়া। মাত্র ছয় মাস প্রেম তারপর বিয়ে। প্রেমে পড়া তরুণের কাছে নতুন কিছু নয়। প্রেমকে সময় হত্যার উৎকৃষ্ট পন্থা হিসেবেই দেখতো তরুণ। সময় হত্যা করেছে তরুণ। ভীষণ বে-হিসেবেই করেছে। কিন্তু উর্মির কাছে এসে বাউন্ডুলে তরুণ হয়ে উঠে গতানুগতিক স্বামী। লেখালেখি করে খুব সামান্যই সম্মানি পায় এতে সংসার চালানো অসম্ভব। তার উপর বিয়ের পর তরুণের কবি সত্ত্বার উপর প্রভাব বিস্তার করে প্রেমিক পুরুষ সত্ত্বা। প্রেমিক পুরুষ জয়ী হলেও নিস্তেজ হয়ে পড়ে কবি সত্ত্বা। কবিতার চাইতে উৎকৃষ্ট মনে হয় উর্মির শরীর। উর্মি তরুণের চোখে হয়ে ওঠে মূর্তিমান কবিতা। তরুণ পাঠ করে। ভীষণভাবে পাঠ করে। কবি পরিচয়ে এক সময় ধুলো জমে। উর্মির সাথে দাম্পত্য কলহ নিত্যদিনের ব্যাপার। প্রথম প্রথম উর্মি অনুরোধ করতো লেখালেখি করার জন্য। তরুণ হাসতো আলতো করে উর্মির চুলে আংগুল চালাতে চালাতে বলতো
বাচ্চা বউ, যতোদিন তুমি আছো আমি কী কবিতা লিখবো? তোমার সামনে আমার কবিতা খুব তুচ্ছ মনে হয়, তুমিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতা।
উর্মি তরুণের কথায় ভালোলাগার, উল্লাসিত হবার যথেষ্ট কারণ খুঁজে পেতো আবার দুঃখবোধটাকেও অস্বীকার করতে পারতো না। তরুণ ওদের সংসারটাকে বলতো “ভালোবাসার যৌথ খামার” ভালোবাসার খামারে খুব দ্রুতই প্রবেশ করে অশুভ অভাব। ভালোবাসার রংগুলো ধুসর হয়ে ওঠে। চাল নুন থেকে বাসা ভাড়া পর্যন্ত সব কিছুই হয়ে ওঠে ঝগড়ার অনুষঙ্গ। সেই ঝগড়ায় সাম্প্রতি যুক্ত হয়েছে নতুন সূত্র “ব্রিফকেস”। উর্মির নিজস্ব একটা ব্রিফকেস আছে। সেই ব্রিফকেস কখনোই তরুণের সামনে বের করে না উর্মি। তরুণের সামনে উর্মির সব বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠলেও ঐ ব্রিফকেস তুমুল রহস্যময়। তরুণের কাছে ব্রিফকেস নিষিদ্ধ করেছে উর্মি আর নিষিদ্ধতার আকর্ষণেই সংক্রামিত হয় তরুণ। নানান রকম কল্পনা করে। কি থাকতে পারে গোপন ব্রিফকেসে?  টাকা? উর্মি কি তবে আলাদাভাবে টাকা জমাচ্ছে অথবা ওর বাবার কাছ থেকেও আনতে পারে, নাহ্ তাই বা কিভাবে হয় অভাবের সংসারে উর্র্মি নিজের কাছে গোপনে টাকা জমাকে এতোটা খারাপ ভাবতে পারে না তরুণ। আচ্ছা এমনও তো হতে পারে স্বর্ণালংকার রেখেছে যা তরুণকে দেখাতে চায়না। পাছে তরুণ গলার চেইনের মতো এগুলোও বন্ধক রাখে সেই ভয়ে। কোন ভাবনাকেই যুক্তি সংগত মনে করে না তরুণ। উর্মির কাছে অসংখ্য বার জবাব চেয়েছে তরুণ কিন্তু জবাব তো পায়নি বরং ঝগড়াই হয়েছে সার। তরুণের কাছে মাঝে মাঝে অসহ্য মনে হয় উর্মিকে। জীবনের হিসাবে কোথাও বড় রকমের ভুল হয়েছে। তরুণ ভুল খোঁজে, পায়না।

তরুণ আবার ফিরে তাকায় উর্মির দিকে। না, উর্মির ভেতর কোন বিকার নেই। প্রতিক্রিয়া শূন্য। দেয়ালমুখী নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। তরুণের বুকের ভেতর জ্বালা করে। উর্মির অবহেলা অসনীয় মনে হয়। হাত রাখা গুস্তাভ ফ্লবার্ট এর “ম্যাডাম বোভারি” বইটা বন্ধ করে সরিয়ে রাখে। লেখার খাতাটা টেনে নেয়
“ভালোবাসার রেশমী বাঁধন কাটে যদি অলীক ইঁদুর
লাভ কি বলো শাঁখা নোয়া সিঁথিতে পরে রক্ত সিঁদুর”
দুই লাইন লিখে খাতাটা বন্ধ করে টেবিলে মাথা ঠেকায় তরুণ চোখ দুটো জ্বালা করে জল আসে।

দুই

শাহাবাগ আজিজ সুপার মার্কেট থেকে বেড়িয়ে ফুটপাথে এসে দাড়ালো তরুণ। সূর্য মাথার উপরে। রাগলে এমনিতেই ঘামতে থাকে তরুণ তার ওপর চৈত্রের উত্তাপ মেজাজটা গরম হতে থাকে। ডান হাতটা প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে তুলে আনে শেষ সম্বল সর্ব সাকুল্যে এগারো টাকা। পাশ দিয়ে যাবার সময় একটি  ছেলে সামনে দাঁড়ায়।
স্লামুআলাই কুম- তরুণ ভাই কেমন আছেন? তরুণ ছেলেটার মুখের দিকে তাকায় ঠিক চিনতে পারে না। ছেলেটা হাত বাড়িয়ে দেয়। তরুণ অনিচ্ছায় হ্যান্ডশ্যাক করে। আবার কথা বলে ছেলেটা
ভাই ইদানিং আপনার লেখা দেখছিনা? লেখালেখি কমিয়ে দিলেননা কি? আমরা একটা সাহিত্য পত্রিকা বের করছি “কবিতার ডাকপিয়ন” নামে সেখানে আপনার একটা লেখা দিতেই হবে। আমি আবার আপনার সাথে যোগাযোগ করবো। আজ তবে আসি স্লামুআলাই কুম…।

ছেলেটা চলে যায় তরুণ তেমনি দাড়িয়ে থাকে। গাড়ি পার্কিংয়ের ওখান থেকে দুইটা বেনসন সিগারেট কিনে। দুই টাকা পকেটে ফেলে হাটতে শুরু করে। আজিজ মার্কেটের এক প্রকাশকের কাছে বেশ কিছু টাকা পায় তরুণ গত দেড় বছরে কয়েক জোড়া স্যান্ডেলের শুকতলি এই রাস্তার ধুলোর সাথে মিশে গেলেও টাকা উঠে আসেনি। আজকে আশা ছিলো যদি কিছু টাকা পাওয়া যায় তবে বাসা ভাড়াটা দিয়ে দেয়া যাবে, আর উর্মির জন্যও কিছু কেনা-কাটা করা দরকার ডাক্তার বারবার বলেছে এই সময় আলাদা যত্ন নেয়া প্রয়োজন চেক-আপও করানো হয়নি।
এখন ছয় মাস চলছে। কিন্তু কিছুই করা সম্ভব নয়। প্রকাশক এক কাপ চা খাইয়ে বিদায় করেছে। সিগারেটের শেষ টান দিয়ে তরুণ ফিল্টারটা ছুড়ে ফেলে ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে খিস্তি ছোড়ে শালা-হারামজাদা। পকস্থলী জানন দিচ্ছে কিছু খাওয়া দরকার। জোড়ে পা চালায় তরুণ। যাত্রাবাড়ী পৌঁছতে পাক্কা দেড় ঘণ্টা। বাসার সামনে এসে দাঁড়ায় তরুণ। একটু সময় কী যেন ভাবে তারপর দরজায় আওয়াজ করে। ভেতর থেকে উর্মির গলা শোনা যায়
কে?
তরুণ জবাব দিতেই দরজা খুলে যায়। উর্মি আলনার কাপড় ভাজ করছে। তরুণ শার্ট খুলে বাথরুমে ঢোকে। বাথরুম থেকে বের হতেই উর্মি মুখ খোলে
টাকা জোগার করছো?
তরুণ জবাব দেয় না।
কি বলছি শুনছো? বাসা ভাড়ার টাকা কই?
নাই প্রকাশক…।
তরুণের কথা শেষ হবার আগেই চিৎকার করে ওঠে উর্মি
তুমি এখন ওঠো দোতলায় যাও বাড়িওয়ালার সাথে কথা বলো, তাকে গিয়ে তোমার প্রকাশকের গল্প শোনাও।
আশ্চার্য এভাবে চেচাচ্ছো কেন? আস্তে কথা বলো।
আমি চেচাই? বাড়িওয়ালা যখন আমার সাথে চেচায় তখন তাকে ঝাড়ি মারতে পারোনা। এখন যাও।
আচ্ছা আগে ভাত দাও। তারপর দেখছি।
রান্না করি নাই
কেন?
বাজার করছো সকালে? তোমার কোন যোগ্যতাটা আছে বলো? একজন রিকশাওয়ালাও তার সংসারের দ্বায়িত্ব পালন করে আর তুমি স্বামী নামের একটা সাইনবোর্ড ছাড়া আর কি দিতে পারছো বলো?
তরুণের মাথায় রক্ত চড়ে যায়। ক্ষুধার্ত প্রাণি এমনিতেই হিংস্র। ভুল পৌরুষ মাথা চাড়া দেয়। মুহূর্তে ছুটে যায় তরুণ উর্মির গালে সশব্দ থাপ্পর বসায়। চুলের মুঠি ধরে পাগলের মতো মারতে থাকে। হঠাৎ উর্মির নাকে রক্ত দেখে থমকে যায় তরুণ। ঘরের দরজায় লাথি মেরে বেড়িয়ে যায় পথে। যাত্রাবাড়ী ওভার ব্রিজের উপরে গিয়ে দাড়ায়। জীবনটা মূল্যহীন মনে হয়। ক্রোধে চোখ জ্বালা করে। এমন সময় একটু দূরে দাঁড়িয়ে ভ্রাম্যমান পতিতা চোখে ইশারা করে। তরুণ প্রথমে খেয়াল না করলেও এক সময় বুঝতে পারে মাথাটা ঝিম মেরে ওঠে, পৃথিবীর তাবৎ নারীকে অসহ্য মনে হয়। দ্রুত পা ফেলে সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, মেয়েটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তরুণ একদলা থু-থু ছুড়ে দেয়  মেয়েটির মুখে। কিংকতব্যবিমূঢ় মেয়েটা ওড়নায় মুখ মুছতে মুছতে বিপরীত দিকে দৌড় দেয়।সন্ধ্যার পর বাসায় ফেরে তরুণ। ঘরের দরজা ভেজানো। ভেতরে ঢুকে উর্মিকে খুঁজে পায় না। ঘরের জিনিসপত্র খেয়াল করতেই বুঝতে পারে উর্মি চলে গেছে। তরুণ বিছানায় শুয়ে পড়ে। চোখ পড়ে ব্রিফকেসে, উর্মি কাপড় চোপর নিয়ে গেছে কিন্তু ব্রিফকেসটা ফেলে গেছে। এই ব্রিফকেসটা নিয়েই অনেক দিন তুমুল ঝগড়া হয়েছে। দু চারদিন কথা বলা বন্ধ থেকেছে। কিন্তু কিছুতেই উর্মি ব্রিফকেসের রহস্য ভাঙ্গেনি। সেই ব্রিফকেস অরক্ষিত অবস্থায় দেখেও তরুণ আগ্রহ বোধ করে না। ইচ্ছে করলেই ব্রিফকেসটা ভেঙ্গে ফেলতে পারে তরুণ উম্মোচিত করতে পারে রহস্য। কিন্তু আগ্রহ বোধ করে না। ঘরটা ভীষণ ফাঁকা মনে হয়। ছাদের দিকে চোখ ঘুরায়। শূন্যতা অসহনীয় মনে হয়। চোখ বন্ধ করে ফেলে তরুণ। বুকের ভেতরটা মোচর দিয়ে ওঠে। হু-হু করে কান্না আসে। তরুণ উপুর হয়ে দু’হাতে বালিশ আকড়ে ধরে মুখটা বালিশে চেপে রাখে।

তিন
এরপর তিনমাস কেটে গেছে। উর্মির বাবা দু’বার ফোন করেছিলো যাবার জন্য, তরুণ যায়নি। উর্মির সৎ মা এসেছিলো, একদিন সকালে অনেক বুঝিয়েছে সমস্যা সমাধান কর সংসার সাজানোর জন্য তরুণ আগ্রহ দেখায়নি ওপথে। উর্মির জন্য তরুণের কষ্ট হয়,  মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় নিজে গিয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু পারেনা। থাক না উর্মি যেভাবে ভালো থাকে। নিজের অক্ষমতার সাথে উর্মিকে জড়াতে চায়না। ডিভোর্সের পরামর্শ দিয়েছে উকিল। তরুণ অপেক্ষায় আছে যতো দ্রুত সম্ভব উর্মিকে মুক্তি দেবে। চিরমুক্তি। নারীর সঙ্গে সংসার করা তরুণের দ্বারা হবে না। এটা বেশ ভালই বুঝে নিয়েছে তরুণ। আরো কিছু পরিবর্তন এসেছে তরুণের মধ্যে লেখালেখির জগত থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। অনেক দূর, না কবিতা, না নারী দু’টোর প্রতি চরম বিরক্ত তরুণ। এক বন্ধুর সাথে কথা হয়েছে গ্রামের বাড়ীতে কিছু জমি আছে তরুণের তা বিক্রি করে মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি দেবে। আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হচ্ছিলো বাহিরে যাবার জন্য এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। তরুণ বিরক্ত বোধ করে সাতসকালে আবার কে এলো? বাড়িওয়ালা আসার কথা নয় চারদিন আগে মাত্র ভাড়া শোধ দিয়েছে। বন্ধুবান্ধবও তেমন কেউ নেই যে, সাতসকালে আসতে পারে। তরুণ দরজা খুলতেই চোখ পরে অপেক্ষমান তরুণীর দিকে। তরুণ চিনতে পারে না। তরুণী নিরবতা ভাঙ্গে
আমি তরুণ আহমেদকে চাচ্ছিলাম
জি আমি তরুণ আহমেদ
আমি বর্ষা, উর্মির বান্ধবী, আপনার সাথে কিছু কথা ছিলো।
আচ্ছা ভেতরে আসুন।
নাহ্ ভেতরে আসবো না। এখানেই বলি আমার একটু তাড়া আছে। আপনাকে এখন আমি যে কথাগুলো বলবো তা আরো পরে বলার কথা ছিলো। কিন্তু তখন হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে। উর্মিকে গত রাতে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ওর অবস্থা খুব খারাপ ওর গর্ভেও সন্তান স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। বাচ্চার পজিশন উল্টে গেছে। ডাক্তার বলেছে এটা খুব রেয়ার ও ক্রিটিকাল কেস। এতে সন্তান অথবা মা যে কোন একজন মারা যাবার ঝুকি খুব বেশি। এই ব্যাপারটা আরো এক সপ্তাহ আগেই জানা গেছে। তখন উর্মি খামটা আমাকে দিয়োছলো আপনাকে দেয়ার জন্য। শর্ত ছিলো যদি ও মারা যায় তবেই আপনাকে দেব। কিন্তু উর্মির কথা আমি রাখতে পারলাম না। এটা আপনাকে দিয়ে গেলাম। বাকি সিদ্ধান্ত আপনার হাতে। বর্ষা একটা চিঠির খাম বাড়িয়ে দিলো তরুণের দিকে। তরুণ খামটা হাতে নিলো। বর্ষা বিদায় নিয়ে চলে যেতেই তরুণ খামটা খুললো একটা চিঠি আর একটা চাবি। চিঠিটা মেলে ধরলো তরুণ

প্রিয় তরুণ,
কেমন আছো সে প্রশ্ন করবো না। কেননা আমি জানি তুমি ভালো নেই। এই চিঠিটা যখন তোমার হাতে পৌঁছবে তখন আমি অনেক দূরে। তোমার বাচ্চাবউটার জন্য দুঃখ করো না। আমাদের সংসার জীবনে তুমি কোনদিন জবাবদিহিতা করোনি। আমি করেছি। আমি জানি আমার কাছেও তোমার অনেক প্রশ্ন ছিলো। আজ নিজ থেকেই সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। আমি তোমার সাথে ঝগড়া করতাম, খুব বেশি ঝগড়া করতাম। কারণ আমি আমার ভালোবাসা তোমার কাছে থেকে লুকিয়ে ছিলাম। ছোট বেলায় মাকে খুব ভালোবাসতাম সবার মতোই। পাঁচ বছরের সময় মা মারা যায়। আমি আমার ভালোবাসার মাকে হারালাম। বাবা অফিসে ব্যাস্ত থাকতো বাবাকে অবলম্বন করে মাকে ভুলে থাকতে চাইলাম। কিন্তু বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করার পর চোখের সামনে বাবাকেও পাল্টে যেতে দেখলাম। সৎ মায়ের কাছ থেকে কখনো ভালো ব্যবহার পাইনি। তারপর থেকে মানুষকে ভালোবাসতে ভয় পেতাম। তুমি আমাকে পুনরায় ভালোবাসতে শেখালে। কিন্তু ভালোবাসাকে ব্যক্ত করিনি যদি তুমিও পাল্টে যাও সেই ভয়ে।
তোমার কবিতা আমাকে এতোটা আলোড়িত করতো আমি অবাক হতাম কিভাবে সম্ভব এতো সুন্দর কবিতা সৃষ্টি। সেই মোহ আমার আজো কাটেনি। কিন্তু আমাদেরম বিয়ের পর তুমি কবিতা লেখা কমিয়ে দিলে, আমি  ভীষণ কষ্ট পেতাম। কারণ আমি তোমাকে গতানুগতিক স্বামী হিসেবে চাইনি আমি ভালোবেসেছিলাম কবি তরুন আহমেদকে, তুমি আমাতে ডুবে রইলে। কবিতা  লেখার সময়গুলো তুমি আমাকে নিয়ে মেতে থাকতে। এটা সত্যি প্রথম প্রথম আমিও আনন্দ পেতাম দাম্পত্য জীবনে আমি সবচেয়ে সুখি ছিলাম। কিন্তু আমার ভেতর যে কবিতা প্রেমি হৃদয় ছিলো তা আহত হলো। তোমার নামে আলোচনা সমালোচনা যা ছাপা হতো তুমি কোনদিন খেয়াল করতে না, আমি করতাম। তোমাকে অনেক বোঝাবার পরেও তুমি বোঝনি। তাই আমি নতুন পথ ধরলাম তোমার কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলাম। রাতে বিছানায় যখন তুমি আমাকে আমন্ত্রণ জানাতে জৈবিক ক্রিয়ায় আমি নিরুত্ত্বাপ ঝগড়া বাঁধাতাম। স্ব-বিরোধে জড়াতাম। আমি জানতাম ঝগড়ার একপর্যায়ে তুমি রাগে দুঃখে বিছানা ছেড়ে লেখার টেবিলে বসবে। আমি পরদিন তোমার লেখার খাতা খুলতাম, নতুন কবিতা খুঁজতাম। অনেক সময় পেতাম অনেক সময় পেতাম না। আমি তোমাকে সাময়িকভাবে দূরে রাখতে চাইতাম তোমার সৃষ্টিশীলতাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু তখনও কি জানতাম আমরা আমাদের স্ব-সৃষ্ট কৃত্রিম দূরত্ব কোনদিন ডিঙ্গাতে পারবো না? তুমি সেদিন রাতে লিখেছিলে “ভালোবাসার রেশমী বাঁধন কাটে যদি আলীক ইঁদুর- লাভ কি বলো শাঁখা, নোয়া সিঁথিতে পড়ে রক্ত সিদুর”। কিন্তু বিশ্বাস করো আলীক ইঁদুর কোন দিন আমাদের ভালোবাসার রেশমী বাঁধন কাটেনি, আমরাই ভেঙেছি শাঁখা, আমরাই মুছেছি সিঁদুর। আর অভাবের কথা শুধু এইটুকু বলি আমিও সাধারণ রক্ত মাংসের গড়া। মাঝে মাঝে সবকিছু বুঝেও নির্বোধের মতোই অভিযোগ জানাতাম।
“ব্রিফকেস” সেই ব্রিফকেস’টার কথা এবার তোমাকে বলি। তোমার কাছে রহস্যময় সেই ব্রিফকেসটা আমার কাছে মূল্যবান ছিলো, ভীষণ মূল্যবান। ওটার ভেতরে আমি জমিয়ে ছিলাম আমার ভালোবাসা। তোমার লেখা যখন কোথাও ছাপা হতো আমি কাটিং করে সংগ্রহ করতাম। তোমার অবর্তমানে একা একা পড়তাম। তুমি জানলে আমার ছেলেমানুষী ধরা পরে যাবে বলে গোপন করছি। সেখানে তোমার সব লেখাই আছে। চাবিটা পাঠিয়ে দিলাম খুলে দেখো। লেখাগুলোর সাথে কিছু জমানো টাকাও পাবে। ওগুলো রেখেছিলাম আমাদের অনাগত সন্তানের জন্য। তুমি ভীষণ আবেগাপ্লুত ছিলে সন্তান কামনায়। মনে আছে তুমি বলেছিলে ছেলে হলে নাম রাখবে ‘শব্দ’ আর মেয়ে হলে ‘কথা’। শত অভাবের মধ্যেও কিছু সঞ্চয় করেছিলাম আমাদের শব্দ অথবা কথার জন্য। পাগল… তুমি আমাকে বাচ্চাবউ বলে ডাকতে। তোমার বাচ্চাবউটার অনেক  দোষ আছে স্বীকার করছি। কিন্তু সে তোমাকে কতোটা ভালোবাসে তা ঈশ্বার জানেন। আমার যতো কৈফিয়ৎ দেয়ার ছিলো দিয়েছি। পারলে তোমার বাচ্চাবউটাকে ক্ষমা করো। আর তোমার কবিতার উপমা হতে চেয়েছিলাম কখনো বাঁধা হতে চাইনি। যখন বুঝতে পেরেছি আমার জন্য কবির মৃত্যু হতে যাচ্ছে তখন নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি। আর ঈশ্বরও চাইছেন আমি সরে যাই। তবে তাই হোক কবি তরুণ আহমেদ অমরত্ত্ব পাক। আমি জানি অপারেশন  টেবিল থেকে যে কোন একজন বাঁচবে আমি অথবা সন্তান। আমি ডাক্তারকে আনুরোধ করবো আমার সন্তানের যেনো কোন ক্ষতি না হয়। তুমি সন্তানকে আগলে রেখো। আর আজ আমার একটা স্বপ্নের কথা তোমাকে বলে যাই আমার স্বপ্ন ছিলো আমার সন্তানকে তোমার মতো করে গড়ে তুলবো। কিন্তু আমি পারবো না… তোমার কাছে অনুরোধ আমার স্বপ্নটা সত্যি করো। আমার জন্য দুঃখ করো না আমি বেঁচে থাকবো তোমার মধ্যে। প্রতিদিন একটা করে কবিতা লিখো, তোমার কবিতার উপমা হতে চেয়েছিলাম। তোমার কবিতার মধ্যেই আমি বেঁচে থাকবো। সুখি হতে চেষ্টা করো। বিদায়।
ইতি
তোমার বাচ্চাবউ (উর্মি)

উপসংহার
সন্তান বাঁচানো যায়নি। উর্মি এখন নিরাপদ। হাসপাতালের বেডে অচেতন শুয়ে আছে উর্মি। উর্মির পায়ের কাছে হাঁটু মুড়ে বসে আছে তরুণ। উর্মির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তরুণের চোখ ছলছল করে ওঠে।  উপস্থিত নার্স, উর্মির বাবা আর সৎ মায়ের মধ্যেও কান্না সংক্রমিত হয়। ছলছল চোখে সবাই তরুণের দিকে তাকিয়ে আছে। তরুণ কাঁদছে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.