বাবা- পর্ব-২

কলাবাগান থেকে বাসে চড়েছি। সিট না পেয়ে দাঁড়িয়ে আছি। রাস্তায় খুব জ্যাম।
আমার সামনের সিটে বসে এক মধ্যবয়সী পুরুষ জোরে জোরে বকবক করছে আর দেশের সিস্টেম আর ট্রাফিকজ্যামের গুষ্টি উদ্ধার করছে। একটু পরপর বাস ড্রাইভারকে লক্ষ করে বলছে “আরে মিয়া একটু সামনে আগাও, চিপাচুপা দিয়া জ্যামের থেকে বের হও। ড্রাইভিং সিটে বইসা কি ঘুমাইতাছো”। আমি চরম বিরক্ত। সহ্য করতে না পেরে হালকা ঝাড়ি দিলাম “ভাই একটু আস্তে কথা বলেন, আপনি তো বাসটা গরম বানাইয়া ফেলছেন”। লোকটা একটু থামলো। কাঁটাবনে এসে বাচাল লোকটার পাশের সিট খালি হলো, আমি বাচালের পাশে বসলাম। একটু পরেই বাচাল আমাকে বললো “কন ভাই এর কোন মানে হয়? জ্যামের তো একটা মাত্রা থাকা উচিত! আর ড্রাইভারটাও ঝিমাইয়া ঝিমাইয়া গাড়ি চালায়, হারামজাদা ট্রাফিক আর ড্রাইভার দুইটারেই থাপড়ানো উচিত। এভাবে গাড়ি যদি চলে তবেতো এরচেয়ে হেঁটে যাওয়া
ভালো”। এমনিতেই গরম চরমে তার উপর বাচালের বকবক। দিলাম আরেকটা ঝাড়ি “আরে ভাই আপনার না পোষালে বাস থেকে নেমে হেঁটে যান, এমনে গরম তার উপর আপনি বকবক করেই যাচ্ছেন। সমস্যা তো সবারই হচ্ছে কেউ আপনার মতো চিৎকার করছে? দয়া করে একটু থামেন”। লোকটা জানালার দিকে তাকিয়ে বিরবির করে কিছু বললো। তার উচ্চস্বর নিচু হলো। একটু পরে বাচালের মোবাইলে একটা কল আসলো। বাচাল মোবাইলে আবার উচ্চস্বরে
কথা বলতে শুরু করলো। বাচাল বলছে “হ্যা হ্যা আব্বু শুনতে পাচ্ছো? এইযে
আব্বু আমি চলে আসতেছি। তুমি স্কুল থেকে বের হইওনা, স্কুলের গেইটের ভিতরে থাকো। কি তুমি স্কুল থেকে বের হইছো কেন? রাস্তায় অনেক গাড়ি তুমি আবার স্কুলের ভেতরে যাও। এইযে আব্বু চলে আসছি আর একটু সময় লাগবে, আমি মৎসভবন চলে আসছি। আহারে আব্বু তুমি স্কুলের ভেতরে যাও
বাহিরে প্রচন্ড রোদ, তোমার রোদ লাগবে। আমি আসতেছি”।
আমি বাচাল বাবাটার দিকে তাকিয়ে আছি। বাচাল বাবাটা ফোন রেখে উঠে দাঁড়ালো। সামনের দিকে উঁকি দিয়ে রাস্তার অবস্থা দেখলো। আমি বাচাল বাবাটাকে দেখছি। সে আমাকে বললো “ভাই একটু সাইড দেন, হেঁটেই যাই”।
আমি সাইড দিলাম, তবুও সে বের হতে গিয়ে আমার পায়ে পাড়া দিলো। সে বললো
“সরি ভাই লেগে গেছে ”
আমি বললাম “আমিও অনেক সরি ভাই”
সে বললো “আপনি সরি কেন? ”
আমি জবাব দিলাম “আমি সরি কারন, আমার বাবা বেঁচে নেই ”
লোকটা আমার জবাব শুনলো কিনা জানিনা। সে দ্রুত বাস থেকে নেমে গেলো। আমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম বাচাল বাবাটা মৎসভবন থেকে কাকরাইলের রাস্তা দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে।
আমার মাথায় কেবল একটা কথাই ঘুরছে
“আমার বাবা বেঁচে নেই। অনেক বছর হয়ে গেলো আমি আর আমার বাবা কেউ
কারো জন্য অপেক্ষা করিনা। আমরা কেউ কারো দিকে ছুটে যাইনা। না হয়
থাকতো এর মতো বাচাল একটা বাবা, মানুষের পায়ে পাড়া দিয়ে সরি বলা
বাবা, ট্রাফিক আর ড্রাইভারকে থাপড়াতে চাওয়া বাবা, তবুও তো বাবা.. যদি
থাকতো। কিন্তু নেই। ”

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.