লাস্ট ষ্টেশন

শীতের শেষের দিক। এসময় একবার হুট করে শীত কিছুটা বেড়ে যায়, অনেকটা কেরোসিন বাতির সলতের নিভে যাবার আগে দপ করে একবার জ্বলে ওঠার মতো। রাস্তায় নতুন ইট ভাঙ্গা বসানো হয়েছিলো রাস্তা মেরামতের জন্য। তারপর সম্ভবত কন্টাক্টার রাস্তার কথা ভুলে গেছে। তাই ভ্যানগাড়িটা ষ্টেশনের দেরমাইল আগেই ছেড়ে দিতে হলো। এই রাস্তায় মধ্যরাতে ভ্যান আসবে না। হাঁটতে হাঁটতে যখন ষ্টেশনে ঢুকলাম তখন তিনটে কুকুর ছাড়া কারো অস্তিত্ব টের পেলাম না। তাই সরাসরি পা বাড়ালাম ষ্টেশন মাস্টারের ঘরের দিকে। স্টেশনমাস্টারের ঘরে মিটমিট করে হ্যারিকেনটা জ্বলছে। সম্ভবত বিদ্যুৎ চলে গেছে। রুমে ঢুকতেই প্রথম যে ভাবনাটা আমার মাথায় ঢুকলো সেটা হচ্ছে
‘হ্যারিকেনের সলতেটা আরেকটু বাড়িয়ে দেয়া দরকার’
যেহেতু আমি একজন আগন্তুক মাত্র, তাই আর হ্যারিকেনের দিকে হাত বাড়ালাম না। স্টেশনমাস্টার একটা কাঠের চেয়ারের স্বল্প জায়গার মধ্যেই এক অদ্ভুত ভঙ্গীতে ঘুমিয়ে আছে। টেবিলের জন্য তার পায়ের অংশটা দেখা যাচ্ছেনা। গায়ের ওপর একটা খদ্দরের চাদর। চাদরের ভেতরে পুরো শরীরটা কুকুর কুন্ডুলী পাকিয়ে আছে। কেবল মুখটুকো বেড়িয়ে আছে।  লোকটা হা করে ঘুমায়। মুখের সামনেই একটা মাছি উড়ছে। যেকোন সময় তার মুখে ঢুকে যেতে পারে। আমি এই চিন্তা থেকেই তাকে জাগিয়ে তোলার জন্য প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশিই জোড়ে চিৎকার করে উঠলাম
“এক্সকিউজ মি, শুনতে পাচ্ছেন? ‘
একটু আড়মোড়া ভেঙে আবার বিপরীত দিকে মুখ ঘুড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়লো লোকটা। আমি আবার চিৎকার দিলাম
হ্যালো শুনতে পাচ্ছেন। আমার খুব জরুরী দরকার”
এবার লোকটা ধড়মড় করে উঠে বসলো। টেবিল থেকে চশমাটা তুলে চোখে পড়ে নিলো। বিগলিত হাসি দিয়ে বললো
একটু ঝিমুনি চলে এসেছিলো। আসলে এই ষ্টেশনে খুব একটা মানুষ আসেনা তো। মশা মাছির সাথে কথা বলে আর কতটা সময় কাটানো যায় বলেন
আমি টেবিলের উপর দুই হাতে কিছুটা ভর রেখে ঝুকে দাঁড়ালাম
দয়া করে বলুন যে লাস্ট ট্রেনটা কি চলে গেছে? আমার ফিরে যাওয়াটা খুব দরকার। অনেকদিন হলো এসেছি
ষ্টেশন মাস্টার মুখে মুচকি হেসে বললো
দেরী করে ফেলেছেন মশাই। দুঘন্টা আগেই চলে গেছে। ট্রেনটা আজকে সময়ের চেয়ে দুঘন্টা আগে এসেছিলো
আর নেক্সট ট্রেন কখন আসবে?
ষ্টেশন মাস্টার আবার চেয়ারে হেলান দিতে দিতে বললো
লাস্ট ট্রেনের নিচে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে একজন। তাই আজকে আর ট্রেন নেই
বিরক্তির চুরান্ত পর্যায়ে মুখ থেকে অস্ফুটভাবে বেড়িয়ে এলো
শুয়ারেরবাচ্চা
স্টেশনমাস্টার আমার গালি শুনে আমার মুখের তাকিয়ে রইলো। আমি তাকে নিশ্চিত করার জন্য বললাম
আপনাকে বলিনি। যে আত্মহত্যা করলো তাকে…
আমি হতাশ হয়ে স্টেশনমাস্টারের রুম থেকে বেড়িয়ে আসছিলাম। এমন সময় পেছন থেকে ডাকলো ষ্টেশন মাস্টার
আপনার যদি ফিরে যাবার বেশি তাড়া থাকে তবে আগামী মঙ্গলবার আসুন। রাত তিনটার আগে আসবেন। ওসময় একটা ট্রেন আসবে
ধন্যবাদ
স্টেশনমাস্টার একরাশ অবজ্ঞা আর ক্ষোভ ছুড়ে দিয়ে বইলো
আসার আগে অবশ্যই মনে করে রেলস্টেশনের মর্গে একটা কল দিয়ে আসবেন। স্টেশনের ফোনটা নষ্ট হয়ে আছে অনেকদিন ধরে। সরকার বাহাদুরের তো সেই খবর নাই…

আমি চুপচাপ স্টেশন থেকে বেড়িয়ে এলাম। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে। স্টেশনমাস্টারের জন্য খুব মায়া লাগছে আমার। আচ্ছা স্টেশনমাস্টারের কি কখনো চলে যেতে ইচ্ছে করে না?

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.